ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ২০:২৭

g এম. এ. মাসুম

 

ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ না থাকলে কোনো দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসা চালু এবং সেটি পরিচালনা করা কতটুকু সহজ বা কঠিন সে বিষয়গুলো কয়েকটি সূচকের আওতায় বিশ্ব ব্যাংক পরিমাপ করে। বিশ্ব ব্যাংকের তৈরি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার সবক’টি দেশের পেছনে পড়েছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা করার পরিবেশের ওপর প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি সচল রাখতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ বিশ্বের প্রায় সব দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ ডুয়িং বিজনেস সূচকে কোন দেশের কি অবস্থা তা বিবেচনা করে থাকে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলতে নিয়ম-কানুনের জটিলতা হ্রাসসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। সার্বিকভাবে দেশকে বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য আইনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

সম্প্রতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশের ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। এতদিন কাঁচামাল আমদানি বা পণ্য রপ্তানির জন্য নিবন্ধন নিতে যে কোনো বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল ব্যবসায়ীদের। আমদানি-রপ্তানির আগেই নিতে হতো কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সনদ। পোশাক কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন সনদ ও কারখানা পরিদর্শন প্রতিবেদনও জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল আমদানি-রপ্তানির জন্য নিবন্ধন নিতে। সম্প্রতি ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করাতে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে এমন অন্তত ২১ ধরনের ডকুমেন্টস থেকে ব্যবসায়ীদের ছাড় দিয়েছে সরকার।

আমদানি-রপ্তানি ও ইন্ডেন্টিং সার্ভিস নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট কমানোর উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আগে আইআরসি পেতে আবেদনের সঙ্গে ২২ ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হতো। এখন ১৩ ধরনের কাগজ দিলেই সনদ মিলবে। একইভাবে বাণিজ্যিক আইআরসি, রপ্তানি সনদ, ইন্ডেন্টিং সার্ভিসের ইআরসির ক্ষেত্রে কাগজপত্রের সংখ্যা ১৪ থেকে ৮টিতে এবং রপ্তানি সনদ (ইআরসি) ১৪টির পরিবর্তে ১১তে নামিয়ে আনা হয়েছে।

জানা যায়, রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত ও সহজ করার জন্য ইএক্সপি ফরম বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে এখন ঘরে বসেই রপ্তানিকারকরা রপ্তানির জন্য ফরম পূরণ করতে পারবেন। তবে বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইএবি), বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিংয়ের কারণে সব ধরনের আমদানি ও রপ্তানির উপর নজর রাখতে পারছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক মুদ্রা আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম উদঘাটন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সহজ হয়েছে।

বন্ডেড ওয়ার হাউজ সুবিধা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভবিষ্যতে বন্ডেড ওয়্যারহাইজের সুবিধা পেতে শর্ত মেনে আবেদনের ৩০ দিনের মধ্যে বন্ড লাইসেন্স পাবেন রফতানিকারকরা। পাশাপাশি লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে পণ্য রফতানির জন্য ৩ দিনের মধ্যে ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউডি) সনদ দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় বন্ড ব্যবস্থাপনার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটেং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রকল্পের অধীনে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জেনারেল বন্ড ইস্যু, লিয়েন ব্যাংক পরিবর্তন বা সংযোজন, মালিকানা পরিবর্তন, স্থায়ী অস্থায়ী ভিত্তিতে কাঁচামাল বা মেশিনারিজ আন্তঃবন্ড স্থানান্তর এবং কারখানা পরিবর্তনের সাময়িক ও চূড়ান্ত সময়সীমা কমিয়ে আনা হচ্ছে।

কোনো কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্যে তুলনা করলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়। সিঙ্গাপুরের ব্যবসা বাণিজ্যের কয়েকটি বিষয়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে রফতানি কার্যক্রমে সীমান্ত বা বন্দরের আনুষঙ্গিক কাজকর্ম সম্পন্ন করতে গড়ে সময় লাগে ১৬৮ ঘণ্টা বা ৭ দিন, সেখানে সিঙ্গাপুরে লাগে ১০ ঘণ্টা। বাংলাদেশে নথিপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় ১৪৭ ঘণ্টা, সেখানে সিঙ্গাপুরে লাগে মাত্র ২ ঘণ্টা। আমদানির নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণে বাংলাদেশে ১৪৪ ঘণ্টা বা ৬ দিন চলে যায়, সেখানে সিঙ্গাপুরে লাগে মাত্র ৩ ঘণ্টা।

মূলত সিঙ্গাপুরের ব্যাবসা বাণিজ্যের সংশ্লিষ্ট সব ধরনের প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক অটোমেশনের আওতায় এসেছে। কোন ব্যবসায়ীর তথ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে সরবরাহ করার ফলে একটি প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুততার সাথে পেয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয় না। ফলে সরকারের পক্ষে দ্রুত সময় ও কম খরচে ব্যবসায়িক সেবা প্রদান করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সব প্রতিষ্ঠান অটোমেশন না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সশরীরে গিয়ে কাজগপত্র জমা দিতে হয়। আবার এক প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়। এ কারণে ব্যবসা বাণিজ্য কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয় এবং ব্যয়ের পরিমাণও প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে এখন থেকেই সে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং উন্নত দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের পরিবেশ অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনলাইন প্লাটফর্ম বা আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে সময়, ব্যয় ও কাগজের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমদানি-রফতানি কাগুজে পদ্ধতি বাতিল করে পুরোপুরি অটোমেশন কার্যক্রম চালু করলে ব্যবসা বাণিজ্যের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং এ খাতে খরচও হ্রাস পাবে।

ছবি: ইন্টারনেট