থাইল্যান্ডের পায়াপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সুসাত বলছিলেন, ‘কোনদিন সুযোগ হলে বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায় যাব। তখন হয়ত আপনার সাথে আবার দেখা হবে।’ বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণকারী এ অধ্যাপক আমাদের আশপাশের প্রায় সব দেশে শিক্ষার ফেরি করে বেড়িয়েছেন, প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্যে সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ না পেলেও তাঁর বুকে বিশ্ব ইজতেমা কেন্দ্রীক এ দেশ সফরের স্বপ্ন রয়েছে।
সুসাতের ন্যায় বাংলাদেশ সফরের স্বপ্নে বিভোর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক ইসলাম প্রিয় মানুষ। কেবল মুসলিম বিশ্ব নয়, ব্রিটেনের টেলিগ্রাফের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ১৫০টি দেশের মুসলমানরা এ মহতি মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে ১৯৪৯ সাল থেকে তাবলিগ জামাত আয়োজিত বাংলাদেশের এ মহতি অনুষ্ঠানে বিদেশী মেহমানের সংখ্যা বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে উঠানামা করে। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সঠিক ইমানের তালিম প্রদান ও গ্রহণের এ সম্মেলনকে বিশ্বের অনেক বড় বড় পত্রিকা ও দেশ অন্যতম শান্তিপূর্ণ সম্মেলন বলে আখ্যা দিয়েছে। ডেইলি মেইলের ভাষ্য মতে, সহজ সরল প্রত্যন্ত অঞ্চলের অংশগ্রহণকারী মানুষগুলো শার্লি এবদোর হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে রাসূল মুহাম্মদ (স) তাঁর বিরোধীতাকারী তায়েফের কাফেরদের ধ্বংসের জন্যে দোয়া করেন নি বরং তাদের ইমানের সাথী করতে চেয়েছেন।’ (মেইল/৯ জানু/২০১৫)।
সারা বিশ্বের জানাশুনা দেশ ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানদের এ সম্মেলনের প্রতি আগ্রহে অনেক গবেষক এর তত্ত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। সারা বিশ্বে যখন কতিপয় ভ্রান্ত ও নামধারী মুসলমান হিংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধে কলংক লেপনের চেষ্টায় রত, তখন এ তাবলিগ জামাত মহব্বতের ধারায় ইমানের যে মেহনত করছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্লামা ইলিয়াস (রহ) এ দাওয়াতী কাজের সূত্রপাত করেন। অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ পাদে মুসলিম সমাজের যে অধোপতন হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মুসলমানদের আকিদা ও ইসলাম রক্ষায় এর বিকল্প ছিল না। এটা দেওবন্দের শিক্ষা ধারার পরিপূরক একটি আন্দোলন হিসেবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পঞ্চাশের দশকে এর প্রভাব কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় থাকলেও সময়ের ব্যবধানে এখন এ দাওয়াতী কাজের বিচরণ বিশ্বব্যাপী। মূলত তাবলিগের ছয় উসূলের মধ্যে মানবিক দাওয়াতের যে প্রেরণা আছে তাই এ আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নীতি আদর্শের মাধ্যমে বিশ্বে ‘পিউরিটিনিজম’ বা শুদ্ধ ইসলামের চর্চা শুরু হয়েছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়ে তা অন্য অনেক মিথের তৈরী করেছে, একথা বললে অত্যুক্তি হবে না বরং এ আন্দোলন নিজেদের মধ্যে অনেক বিবেদের সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বে ইসলামী মূল্যবোধ হুমকির মুখে পড়েছে। আমেরিকান গবেষক নিকোলাস হাউইস্টিন মনে করেন ‘আসলে তাবলিগ জামাতের ইসলাম প্রচারে সরলতা, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা, অপরকে সম্মান করে কথা বলা শিক্ষা এবং প্রচলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ তাদের কর্মপদ্ধতির অংশ।’ (ইসলামিস্ট নেট ওয়ার্ক: এ কেস অব তাবলিগ জামাত)।
সার্বিক বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও সরল ধারণার কারণেই বিশ্ব মুসলিম সমাজের প্রতিটি স্তরে এ আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রগতিশীল বিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়া পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে তাবলিগের ব্যাপক উপস্থিতি তারই প্রমাণবহ। বিভিন্ন মতাদর্শের পক্ষে কাজ করতে করতে তারা এখন অনেকটা ক্লান্ত। গাম্বিয়া, মরক্কো মালিসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদের দেশের মতই। শহরে সেখানেও উচ্চবিত্ত ও এলিট শ্রেণীর বাস। ঠিক এর বিপরীতে গ্রাম ও পাহাড়ী অঞ্চলে যে অশিক্ষিত ও অনুন্নত জীবনযাত্রায় অভ্যস্থ মুসলমানেরা রয়েছেন তাদের বিভিন্ন ইসলামিক গোষ্ঠী বিভিন্ন নামে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এখনো এ যুদ্ধ সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও নাইজারকে পর্যদস্তু করছে প্রতিনিয়ত। মুসলমানরা এখন এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। যেখানে কোন নেতা ও দলের স্বার্থে কাজ হবে না বরং কাজ হবে নিজের জন্যে। নিজের ঈমানের জন্যে। এ হতাশাগ্রস্ত সমাজে তাবলিগ কেবল তাদের ইমানকেই শুদ্ধ করছে না বরং বাঁচার প্রেরণাও দিচ্ছে। কেবল দরিদ্র বিশ্বে নয় হতাশাগ্রস্থ উন্নত বিশ্বের অনেকেই মানসিক শান্তি চায়। অর্থের পিছনে দৌড়ে ক্লান্ত মানুষগুলো মাইক্রো আর ম্যাক্রোর জটিলতত্ত্বের সাথে সাথে জীবনবোধের ছায়াতলেও আসতে চায়। ইসলামের মধ্যে এ সুশীতল ছায়া আছে বলে অনেকে মনে করেন।
প্রতিদিনই লন্ডনের নিউহাম তাবলিগ মারকাজে অনেক ভ্রমণকারী আসেন। তারা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেন কিভাবে তাবলিগের সাথে যুক্ত এ মানুষগুলো জীবনদর্শনকে সহজ করে নিয়েছে। ভক্তির পরাকাষ্টায় জীবনকে কিভাবে সপে দিয়েছে। সুমহান এ আদর্শ অনেককেই আবেগ তাড়িত করে, কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে চায়। এ স্ব-প্রণোদিত ইসলাম গ্রহণকে কেউ আবার ধর্মান্তকরণের অভিযোগে অভিযুক্তও করেছেন। কিন্তু তাতে কি তাদের এখানে আসা বন্ধ হয়েছে? জানতে চেয়েছিলাম লন্ডন প্রবাসী আমার এক বন্ধুর কাছে। তিনি বললেন, দিন দিন তাদের আসার গতি কেবল বেড়েই চলেছে। কেবল ইউরোপেই নয় এরূপ চরিত্র দূরপ্রাচ্যেও লক্ষনীয়। ২০০৩ সালে থাইল্যান্ডের নাখন শ্রী থামারাত প্রদেশে তাবলিগের জামাতে লক্ষাধিক মুসলমানের উপস্থিতি অনেক অমুসলিম বন্ধুদের গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সারা বছর তাবলিগের এ স্ব-প্রণোদিত কাজ সত্যিকার ইসলাম জানা ও বুঝার জন্যে। ইকরামুল মুসলিমিনের মাধ্যমে অপরকে সম্মান ও ইসলাহিয়াতের যে সংস্কৃতি তাবলিগ জামাত গড়ে তুলেছে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কর্মের ব্যাপারে কিছু বিতর্ক উঠলেও তা হালে পানি পাবে না যদি তারা এ ধারা অব্যাহত রাখেন। মহতি এ আন্দোলন ওয়াহদাতুল উম্মাহর প্রেরণাকে যেন আরো শাণিত করছে বারবার। সারা বিশ্বের মুসলমানগণ সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্রের মাঝেও নিজেদের পরস্পরকে আপন করে নেওয়ার যে রেওয়াজ গড়ে তুলেছেন তা সত্যিই প্রেরণাদায়ী। প্রেরণার এ শান্তির কপোতে বিশ্ব হয়ে উঠুক আরো শান্তিময়।
লেখক: অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
