রায়ের অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০

রবিবার রাতে কেউ ঘুমাতে পারেনি। স্বজন হারানোর শোক নতুন করে আরো বেড়েছে। সবাই অপেক্ষায় ছিলেন। কখন জানা যাবে সেই রায়। অবশেষে জানা গেল, নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার রায়ে ২৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণের পর খুন করে ফেলা সাতজনের স্বজনরা রায়ে খুশি। দ্রুত রায় কার্যকরের দাবিও জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।

 
নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের বাসা সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায়। তার মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমরা চার বোন। আমাদের কোনো ভাই নেই। আমার ছোট বোন সুপ্তিকে কোচিংয়ে দেওয়ার জন্য বাবা দ্রুত বাসায় ফিরছিলেন। সে সময়ই ঘটে ওই ঘটনা। ঘটনার পর থেকে আমাদের পরিবারটি থেমে গেছে। এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি।
 
তিনি জেলা জজ কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। বলেন, এই কোর্টেই প্রাকটিস করতেন বাবা। এখানেই তার খুনের বিচারের রায় হয়েছে। অপরাধীরা শাস্তি পেয়েছে এতে অন্তত আমার বাবার আত্না শান্তি পাবে।
 
সুস্মিতা সরকার বলেন, আমার বাবা কখনও কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। তবে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। আমাদেরও তাই শিখিয়ে গেছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
 
তিনি বলেন, আমার বাবা নিজেদের জন্য না করতে পারলেও অন্যের জন্য সবসময় করতেন। নিজের জীবনটাও অন্যের জন্য দিয়ে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন। আমার বাবা যখন মারা যায় তখন আমার পরীক্ষা ছিল। আমার ছোট বোনকে খুব আদর করতেন বাবা। ও এখনো বিশ্বাস করে বাবা ফিরে আসবে। আমার বোনটা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। ছোট বোন আগে পরীক্ষায় প্রথম হতো। এখন পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। 
 
চন্দন সরকারের গাড়ি চালক ইব্রাহীমের বাড়ি সোনারগাঁ উপজেলার আলগীর চর এলাকায়। সেখানে তার দুই স্ত্রী হনুফা ও মাহমুদা সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন। রায় শুনতে আদালতে আসেননি। বিকেলে বাসায় গিয়ে হনুফাকে পাওয়া গেল। ঘরেই বসে আছেন। কোলে তার ছেলে জোনায়েদ। হনুফা রায়ের বিষয়ে জানায়, রায় সন্তুষ্ট। তাদের দ্রুত ফাঁসি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
 
সাত খুনের ঘটনায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তার ২ ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকায়। সাত খুনের মামলার অন্যতম বাদী সে। নজরুলসহ নিহত পাঁচজনের খুনের মামলার বাদী তিনি। তাদের বাসায় গিয়ে রায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিনা ইসলাম বিউটি সন্তোষজনক রায় দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান। এ সময় তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলেও দাবি করেন। আসামি পক্ষের লোকজন তাদেরকে অনুসরণ করছে এবং তারা নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
 
তাদের বাসার একটু দূরেই নিহত তাজুল ইসলামের বাড়ি। তাজুলের বাবা আবুল খায়ের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান। তিনি তার জীবদ্দশায় রায় কার্যকর দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
 
নিহত লিটনের বাড়ি সানারপাড় এলাকায়। তার ভাই মিন্টু জানায়, লিটনের নিহতের ঘটনার পর থেকে পরিবারটি থমকে আছে। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তিনিও রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।
 
সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকায় নিহত স্বপনের বাড়ি। বাসায় গেলে নিহত স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ সময় স্বপনের ভাই রিপন জানান, ভাই নিহতের পর থেকে ভাবি প্রায়ই নির্বাক। তার দুই মেয়ে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তায় থাকেন। রায়ে তার পরিবারের সকলেই সন্তুষ্ট। তবে রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চায় পরিবারের সকলেই।
 
একই এলাকায় বসবাস করেন নিহত গাড়ি চালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামছুন্নাহার নুপুর। সে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক অফিসে দৈনিক মুজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। জাহাঙ্গীর নিহতের সময় গর্ভে থাকা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার নাম রাখা হয় রোজা। তাকেই নিয়েই সে শাশুড়ির সাথে বসবাস করে আসছেন। রায়ের বিষয়ে নুপুর জানান, ফাঁসির রায় দিছে তয় আমগো কি হইবো। আমার মেয়ের ভবিষ্যত্ কি? এই কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার শাশুড়ি রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রায় কার্যকর করার দাবি জানান। তিনি আরও জানান, আমি জীবিত থাকতে রায় কার্যকর দেখে যেতে যাই।

ইত্তেফাক/এএন