জলসা ঘরেই নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা হয়

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৭, ২৩:৪৩

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের একাধিক জলসা ঘরের সন্ধান পেয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব জলসা ঘরে সন্ধ্যা নামলেই, কখনো বা দিনে-দুপুরেও বসত জমজমাট আসর। সেখানে গিয়ে মদ, নারী আর জুয়ায় মত্ত থাকতেন অনেক হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিও। কিন্তু সেই সব জলসা ঘরে এখন আর আলোও জ্বলে না। এসব জলসা ঘরের এখন বেহাল দশা। দেখে মনে হবে ভূতের বাড়ি!

 
সেই জলসা ঘরে বসেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা করে নূর হোসেন।  
 
জানা গেছে, নূর হোসেনের বাড়ির উত্তরে মাছের খামারের মাঝে ঘর নির্মাণ করে সেই ঘরে পার্টি বসত। সিদ্ধিরগঞ্জে আটি হাউজিং এলাকায় মিজি ভবন-১ নামে একটি ষষ্ঠতলা ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানেও মাদক ও সুন্দরীদের নিয়ে আড্ডা বসাতেন নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে কাঁচপুর ল্যান্ডি স্টেশনের ওপরের তৃতীয় তলায় বসত রাতভর জলসা। নূর হোসেনের নিজ বাড়ির দোতলায়ও মাঝে মধ্যে পার্টি বসত। এছাড়া শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে কাউন্সিলর অফিসের পশ্চিম পাশের একটি কক্ষেও মাঝে মধ্যে পার্টি বসাতেন নূর হোসেন।
 
অশ্লীল নৃত্য আর সুন্দরী নারীই ছিল তার জলসা ঘরের আকর্ষণ। নৃত্যের আসরের সঙ্গে চলত মাদক আর জুয়ার জমজমাট আড্ডা। হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের এসব জলসায় অতিথি করে নূর হোসেন দুই হাতে কামিয়ে নিয়েছেন অর্থ-বিত্ত। করায়ত্ত করেছেন ক্ষমতা আর আধিপত্য। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সমাজের উঁচু স্তরের লোকজনই ছিল তার এসব জলসা ঘরের অতিথি। সাত খুনের ঘটনার পরে কেউ সেই জলসা ঘরে আসে না। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেই জলসা ঘর এখন স্যাঁতসেতে, নোংরা ও ব্যবহারের অনুপযোগী  হয়ে পড়ে আছে। কাছেই বসবাসকারী দুই ব্যক্তি ইত্তেফাককে বলেন, জলসা ঘর ডুবছে, নূর হোসেনও ডুবেছে।
 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতে ওইসব জলসা ঘরে দামি গাড়ি নিয়ে আসতেন অনেকে। ভোর হওয়ার আগেই তারা সেই স্থান ত্যাগ করতেন। এছাড়া চিত্র জগতের অনেক উঠতি নায়িকা এবং মডেলের আনাগোনাও ছিল সেসব জলসা ঘরে। প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে তার সকল অপকর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতেন নূর হোসেন।
 
বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে নূর হোসেনের বাড়ির পাশের জলসা ঘরটি টিকে থাকলেও সেই জৌলুস আর নেই। ব্যবহার না করায় ভেঙে পড়েছে ঘরের অংশ বিশেষ। জলসা ঘর হিসেবে ব্যবহূত অন্য ফ্ল্যাট বা স্থানগুলোতেও এখন আর কোনো আসর বসে না।
 
স্থানীয়রা জানান, শিল্প নগরী নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জসহ অধিকাংশ এলাকার অঘোষিত ‘মালিক’ ছিলেন নূর হোসেন। তার নির্দেশই এখানে আইন। ফলে এই এলাকায় ফ্রি স্টাইলে সংঘটিত হতো খুন, অপহরণ, দখল, নির্যাতন ও জখমের ঘটনা। চাঁদার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহন ও শিল্প মালিকরা থাকতেন ভয়ে নিশ্চুপ। নূর হোসেনের ভয়ে স্থানীয়রা পর্যন্ত প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না।
 
পড়ে আছে ২০টি বাস: খামারের পশ্চিম পাশে ফজলুর রহমান পেট্রোল পাম্পের সাথে ফাঁকা জায়গায় রয়েছে নূর হোসেন পরিচালিত এবিএস পরিবহনের প্রায় ২০টি বাস। এ পরিবহনের বাসগুলি নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা সড়কে চলাচল করত। নূর হোসেন পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাসগুলি এখানেই সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে। দীর্ঘ আড়াই বছরে বাসের কোনো কিছুই সচল নেই। বর্তমানে এসব বাসে কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। যন্ত্রাংশ সব খুলে নিয়ে গেছে কে বা কারা। বাসের চাকাও ডেবে আছে মাটির নিচে।
 
নূর হোসেন এখন কনডেম সেলে: এক সময়ে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনকে যে নূর হোসেন নিয়ন্ত্রণ করতেন, সন্ত্রাসীদের গডফাদার নূর হোসেন এখন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলে অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে ভারতে আটকের পর বাংলাদেশের কারাগারে আনার পর কারাগারে বসেই নূর হোসেন তার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। শুধু তাই নয় সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে তার অনুগতদের নির্বাচিতও করিয়েছেন। সেই নূর হোসেনসহ অপর চারজন র্যাবের বহিষ্কৃত কর্মকর্তা এখন কনডেম সেলে। গত সোমবার নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন সাত খুন মামলায় ফাঁসির দণ্ড প্রদান করেন। গতকাল  মঙ্গলবার পর্যন্ত হাই কোর্টে রায়ের কপি পৌঁছেনি।
 
নারায়ণগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, বিচারিক আদালতের সকল কাগজ-পত্র নথিসহ রায় হাই কোর্টে পাঠানোর কাজ চলছে। সাতদিনের মধ্যে এইসব কাগজপত্র পাঠাতে হবে। আজ বুধবারের মধ্যে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় এলসিআর এর সকল কাগজপত্র হাই কোর্টে পাঠাতে পারবো বলে আশা করছি।
 
নজরুল কেন টার্গেট ছিলেন? সিদ্দিরগঞ্জ, সিমরাইল বাস স্টান্ড, আদমজী ইপিজেড এলাকার টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নজরুলের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে। উভয়পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।  এক পর্যায়ে এলাকার অপরাধ জগতের একক আধিপত্যের জন্যই প্রায় ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে নূর হোসেন নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ঘটনার সময় নজরুলের গাড়ির চালকসহ অপর তিন সহযোগী তার সঙ্গে থাকায় এবং পিছনে থেকে ঘটনাটি দেখে ফেলায় এডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালককে জীবন দিতে হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএন