ক্রিকেটার আরাফাত সানির বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে মামলা করার পর এবার যৌতুকের দাবিতে মারধরের অভিযোগে আদালতে আরেকটি মামলা করেছেন তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া সেই তরুণী। ঢাকার মহানগর হাকিম রায়হানুল ইসলাম সোমবার নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে সানির বিরুদ্ধে সমন জারির আদেশ দিয়েছেন। সানিকে আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে তার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনে করা এ মামলায় ২০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে মারধর করার অভিযোগ আনা হয়েছে আরাফাত সানির বিরুদ্ধে।
বাদীর আইনজীবী মো. কামাল উদ্দিন বলেছেন, আরাফাত সানির সঙ্গে ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ওই তরুণীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা বাসা ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে থেকেছেন। একসঙ্গে তারা বিদেশে বেড়াতেও গিয়েছেন। ওই তরুণীর অভিযোগ, সানির পরিবার তাদের বিয়ে মেনে না নেওয়ায় তাকে তুলে নেওয়া হয়নি। এক পর্যায়ে সানি তার কাছে ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং টাকা দিলে ঘরে তুলে নেবেন বলে জানান। যৌতুকের দাবিতে তাকে মারধরও করা হয়।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর পাঁচ লাখ এক টাকা দেন মোহরে তাদের বিয়ে হয়। এরপর বাদীর বোনোর বাড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার শুরু করেন। তবে বিয়ের ছয় মাস যেতে না যেতে সানি ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। গত বছরে ২৩ ডিসেম্বর যৌতুকের টাকা না দিলে ও বেশি বাড়াবাড়ি করলে পরিণতি খারাপ হবে এবং তাদের অন্তরঙ্গ ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেন আরাফাত সানি। এরপর মামলার বাদী ২৫ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
মামলার আর্জিতে আরাফাত সানির মা নার্গিস বেগমকেও আসামি করার আবেদন করেছিলেন ওই তরুণী। তবে আদালত কেবল সানির বিরুদ্ধে মামলা আমলে নিয়েছে বলে আইনজীবী কামাল উদ্দিন জানান। এর আগে গত ৫ জানুয়ারি ওই তরুণী তথ্য-প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেন, যে মামলায় গত রবিবার আমিনবাজার থেকে ক্রিকেটার সানিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রবিবার দুপুরে সানিকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড চাইলে মহানগর হাকিম প্রণব কুমার হুই এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
তথ্যর ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সাত বছর আগে পরিচয়ের পর সানির সঙ্গে ওই তরুণীর প্রেম হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তারা পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করেন। এরপর বিয়ের বিষয়টি পরিবারকে জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়ার কথা বললেও সানি সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন। ২১ বছর বয়সী ওই তরুণীর অভিযোগ, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রী হিসেবে তাকে তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিলে গত বছর জুন মাসে সানি ফেইসবুকে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে মেসেঞ্জারে তাদের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি পাঠান এবং নানাভাবে হুমকি দিতে শুরু করেন। তবে সানির মা নার্গিস আক্তারের দাবি, টাকার লোভে ওই মেয়ে সানিকে ‘ফাঁসানোর’ চেষ্টা করছে। ওই মেয়ের কাছে বিয়ের কোন কাবিনামা নেই বলেও দাবি করেন নার্গিস আক্তার।
এদিকে ওই তরুণী সোমবার সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘আমি তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। সবকিছু ঠিকই ছিলো, কিন্তু হঠাত্ করেই সে চেঞ্জ হয়ে গেছে। সে কেন এমন করলো আমি বুঝতেছি না। আমি মামলা করতে চাইনি। আমি তার শাস্তি চাই। সানি এখনও বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করছে। থানায় বসেও সে অস্বীকার করেছে।’
ওই তরুণীর ভাষায়, ‘কান্নাকাটি করে’ সানি তার বিয়ে ভেঙে দেন। পরিবারের অমতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে গোপনে তারা বিয়ে করেন। সম্প্রতি সামাজিক স্বীকৃতি চাওয়ার পর থেকেই সানি তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকেন। বিয়ের কথাও অস্বীকার করে সানি। তাই সানির আসল চেহারা সবার সামনে তুলে ধরতেই তিনি মামলা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সানি ভালো মানুষের মাস্ক (মুখোশ) পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
ওই তরুণী বলেন, ‘এক কমন বন্ধুর মাধ্যমে ২০০৯ সালে ধানমণ্ডিতে আমাদের পরিচয় হয়। তখন আমি স্থানীয় একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সানি ধানমণ্ডিতে অনুশীলন করতে আসতো। ওই সময় তাকে কেউ চিনতোও না। তখন সে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগও (বিপিএল) খেলার সুযোগ পায়নি। আমাদের নিয়মিত ফোনে কথা ও দেখা হতো। পরিচয়ের ছয়মাস পর আমরা প্রেমে পড়ি। আমাদের এই সম্পর্ক দুই পরিবারের কেউ মেনে নেয়নি। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরে আমার পরিবার আমার বিয়ে ঠিক করে। ওই সময় জাতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে সানি চট্টগ্রামে ছিল। আমার বিয়ের কথা জানতে পেরে সে আমার মেজো বোনের স্বামীকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে। এরপর বিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়।’
তরুণী আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে সানি ঢাকায় ফিরে ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমাকে বিয়ে করে। আমাদের বিয়ের দেনমোহর ছিল পাঁচ লাখ টাকা। বিয়ের পর আমি আর সানি আমার মেজো বোনের বাসায় উঠি। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বিষয়টি জানে। আমাকে একটি বাসাভাড়া করেও দিয়েছিল, সেখানে থাকতাম।’
তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৪ মে আমরা থাইল্যান্ডে ঘুরতে যাই। সেখান থেকে ২৯ মে দেশে ফিরে আসি। এরপর আমি তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বারবার বলতে থাকি। সে নানা অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। আমি একবার ওদের বাসাতেও গিয়েছিলাম। ওর পরিবারও বিষয়টি জানে।’
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি, ওই ছবিগুলো সানির মোবাইল থেকেই পাঠানো হয়েছিল। তার (সানি) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিকভাবে আমরা সত্যতা পেয়েছি। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের পর বিষয়টি জানা যাবে।’
ইত্তেফাক/ইউবি/এমআই
