ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজিয়ে স্বামীই খুন করে স্ত্রীকে

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১৯:২৯
পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় স্ত্রীকে। ঘটনার দিনই স্বামী দাবি করেছিল ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। তবে পুলিশের তদন্ত এবং আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে প্রকৃত চিত্র। 
 
তাতে দেখা যায়, ভাড়াটে খুনি দ্বারা স্বামী জাহিদ হোসেন জুয়েল নিজেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জাহিদসহ তিন আসামির ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন। ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল খারিজ করে এ রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মো. জাহিদ হোসেন জুয়েল, মো. শাহিন আলম ওরফে শাহিন, মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিজানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। এরা সকলেই করাগারে আছেন। 
 
মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, রাজধানীর পূর্ব গোরানের অধিবাসী আবুল হোসেনের পুত্র জাহিদ হোসেনের সঙ্গে ২০০৫ সালের ২০মে বিয়ে হয় তাহমিনা শারমিন তানিয়ার (২৮)। বিয়ের পর তাদের মধ্যে দেখা দেয় দাম্পত্য কলহ। এই কলহের জের ধরেই স্ত্রীকে খুনের পরিকল্পনা করে স্বামী। এজন্য খুনিও ভাড়া করা হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহিদ স্ত্রী তানিয়া, দশ মাস বয়সী পুত্র ও গাড়ির চালক শাহিনকে নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে যান। কুয়াকাটায় ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে ২০০৭ সালের ৩০ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় উপর্যুপুরি ছুরিকাঘাতে তানিয়াকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কলাপাড়া থানায় মামলা করেন নিহতের ভাই রায়হান গফুর। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন নিহতের স্বামী জাহিদ, গাড়ির চালক শাহিন ও ভাড়াটিয়া খুনি মিজান। 
 
জবানবন্দিতে চালক শাহিন বলেছেন, রাজনীতি করা থেকে জাহিদ হোসেনের সঙ্গে ৪/৫ বছর পূর্ব থেকে পরিচয়। তাদের বিয়েতেও আমি গিয়েছিলাম। হত্যাকাণ্ডের ৩/৪ দিন আগে জাহিদ আমাকে বলে তার ঘনিষ্ট একজনকে খুন করতে হবে। মিজানকে জিজ্ঞাসা কর পারবে কিনা? মিজানকে বিষয়টি জানালে বলে কোন অসুবিধা নেই। এ কাজের জন্য আমাদের এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে জাহিদ। 
 
জবানবন্দিতে শাহিন আরো বলেন, ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি সকালে খিলগাঁও তালতলা মার্কেট থেকে জাহিদ ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে তার স্ত্রীকে উঠিয়ে কুয়াকাটার উদ্দেশে রওনা হই। গাড়িতে জাহিদ, তার স্ত্রী তানিয়া ও দশ মাস বয়সী পুত্র সন্তান ছিল। রাত দেড়টায় কুয়াকাটায় পৌঁছাই। আমি সমুদ্র বিলাসে এবং তারা পর্যটন হোটেলে উঠে। পরের দিন মিজান কুয়াকাটায় এসে আমাকে ফোন দেয়। সে একটা ব্যাগে আঙ্গুর, আপেল এবং পেপার দিয়ে পেচিয়ে একটা চাকু ও খুর নিয়ে আসে। মিজানও সমুদ্র বিলাস হোটেলে উঠে। জাহিদ কুয়াকাটায় খরচের জন্য আমাদের ২ হাজার টাকা দেয়। মিজানের কথা অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি বিকালে রওনা হই। মিজান আমাকে বলে তিন ফেরি পার হয়ে সামনে আগালে মোবাইল ফোনের আলো দিয়ে সংকেত দিলে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে বলে থামাবে। এসব পরিকল্পনার কথা জাহিদকে জানানো হয়। জাহিদও বলে সব ঠিক আছে কিনা? আমি বলি মিজান বলেছে সব ঠিক আছে। তৃতীয় ফেরি থেকে নেমে দেড় কিলোমিটার সামনে যাওয়ার পর মিজানের সংকেত পাই। তখন আমি গাড়ি থেকে নেমে সামনের বনেট খুলি। এরই মধ্যে সন্তান নিয়ে জাহিদ গাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। মিজান বাম পাশের দরজা খুলে ছুড়ি দিয়ে তানিয়া ভাবীর পেটে আঘাত করে টেনে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। ভাবী উঠার চেষ্টা করে এবং বলে জাহিদ আমাকে বাঁচাও। কিন্তু জাহিদ ভাই ভাবিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। মিজান আবার আঘাত করে। জাহিদ আমাকে বলে মরেছে কিনা দেখতে। আমি নাক মুখ ধরে দেখি শ্বাস-প্রশ্বাস নেই। আমি জাহিদকে বলি ভাবী মারা গেছে। মিজান বলে কাজ শেষ। জাহিদ ভাই মিজানকে মোবাইল, ঘড়ি, মানিব্যাগ, দেড় হাজার টাকা দেয়। মিজান খুর দিয়ে জাহিদ ভাইয়ের পিঠে, বুকে ও উরুতে পোচ দেয়। আমি পিঠের ডান পাশে চাকু দিয়ে একটা টান দেই। ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজানোর জন্য জাহিদ ভাইয়ের গায়ে ৪/৫টা হালকা পোচ দেই। 
 
জাহিদ ভাই আমাদেরকে তার গাড়ি নিয়ে যেতে বলে। ৪/৫ মাস পর ঝামালে গেলে বাকি টাকা দিয়ে দেওয়ার কথা বলে। গাড়িতে থাকা দুটি ক্যামেরা মিজান নিয়ে যায়। আমি গাড়ি নিয়ে রওনা হই। কিছুদূর যাওয়ার পর হাত পা কাপার কারণে আমি আর গাড়ি চালাতে পারিনি। তখন মিজান গাড়ি চালায় এবং আমি পেছনের সিটে এসে বসি। ৩০/৪০ কিলোমিটার যাওয়ার পর গাড়ি ফেলে রেখে দু’জনে পালিয়ে যাই। পরের দিন ঘটনা পত্রিকায় দেখে ভয় পেয়ে যাই। পরে পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে।
 
জাহিদ তার জবানবন্দিতে বলেছেন, তানিয়র সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর আমরা ঢাকার খিলগাঁওয়ে বসবাস করতে থাকি। সাংসারিক বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো। বিবাহের পূর্বে আমার সাথে আমার খালাত বোনের প্রেম ছিল। কিন্তু বিয়ের পর এ সম্পর্ক আর এগোয়নি। আমি আমার গাড়ির চালক শাহীনের সঙ্গে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করি। প্রথমে যমুনা ব্রিজের দিকে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করি। কিন্তু শাহীন বলে কুয়াকাটায় নিয়ে কাজ করতে নিরাপদ হবে। সে কথা মত ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি আমরা কুয়াকাটা যাই এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্ত্রীকে হত্যা করি। পরে এটিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে দাবি করি।
 
এই হত্যা মামলায় ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর জেলা ও দায়রা জজ তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে মৃত্যুদণ্ডের রায় নিশ্চিতকরণের জন্য নথি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০১২ সালের ৮ জুলাই বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম ও বিচারপতি আনম বশিরউল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ আপিল খারিজ করে দিয়ে তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। মঙ্গলবার আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান ও আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান শুনানি করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে ফাঁসির রায় বহাল রাখে। 
 
ইত্তেফাক/এমআই