জোর যাহার মুল্লুক তাহার!

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ২২:২২

পরাশক্তিদের অঙ্গুলিহেলনে কোনো মুল্লুক দখল কিংবা দখলকৃত মুল্লুকের স্বীকৃতিদান নূতন কোনো বিষয় নহে। বাংলায় প্রবাদ আছে—জোর যাহার মুল্লুক তাহার। গত সোমবার অধিকৃত গোলান উপত্যকায় ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  ট্রাম্পের এই স্বীকৃতির পর সিরিয়া এবং বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাইলেও ইসরায়েল এবং ট্রাম্পের যেন তাহাতে কিছু যায় আসে না। ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ যে, একটি দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ—তাহার প্রতি যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নাই আমেরিকার।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর নজরদারির জন্য গোলান মালভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সিরিয়ার গোলান উপত্যকা দখল করে ইসরায়েল। এই মালভূমি হইতে মাত্র ৪০ মাইল দূরে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক শহর। দক্ষিণ সিরিয়ার একটি বড় অংশ স্পষ্ট দেখা যায় এই স্থান হইতে। তাহা ছাড়া পার্বত্য এলাকা বিধায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কোনো সম্ভাব্য আক্রমণের পথে এই মালভূমি একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসাবে কাজ করে। অর্থনৈতিক দিক হইতেও ইহা গুরুত্বপূর্ণ। এই মালভূমি হইতে পানি প্রবাহিত হইয়া মিশিয়াছে জর্ডন নদীতে। ইসরায়েলের পানি সরবরাহের এক তৃতীয়াংশের উত্স ইহা। তাহা ছাড়া জায়গাটি উর্বর বিধায় প্রচুর ফল ও আঙুরের ফলন হয়। পশুপালনের জন্যও জায়গাটি আদর্শস্থানীয়। প্রায় ১২ শত বর্গ কিলোমিটারের এই জায়গাটি ৫২ বত্সর পূর্বে ইসরায়েল দখল করিবার পর এখানকার সিরিয়ান আরব বাসিন্দাদের অধিকাংশই বিতাড়িত হইয়া পড়েন। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে সিরিয়া ইহাকে পুনর্দখল করিবার চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হয়। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল গোলানকে নিজের অংশ করিয়া লয় একতরফাভাবে। ইসরায়েল অত্রাঞ্চল দখলের পরে আদি বাসিন্দাদের উত্পাদিত ফসলাদি সিরিয়াতে বিক্রয় করিতে বাধা দিতে থাকে। আস্তে আস্তে সাধারণ জনগণকে তাহাদের ইচ্ছামতো ফল-ফলাদি চাষ করিবার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে ইসরায়েল। তাহার পরে আরব বা সিরিয়ানদের ওপর আরোপ করা হয় অতিরিক্ত ট্যাক্স। বর্তমানে এইখানে ইসরায়েলের ৩০টির বেশি বসতিতে ২০ হাজারের মতো ইহুদি বসবাস করিতেছে। অন্যদিকে মালভূমির অপর প্রান্তে বসবাস করিতেছে ২০ হাজারের মতো দ্রুজ আরব জনগোষ্ঠী—যাহারা ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় ওই এলাকা হইতে বিতাড়িত হন। এই দ্রুজরাই ওই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা।

জাতিসংঘ মহাসচিবের একজন মুখপাত্র অবশ্য জানাইয়াছেন যে, গোলান উপত্যকা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের অবস্থান আগের মতোই। অর্থাত্ গোলানে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান করিবে না জাতিসংঘ। তিন বত্সর পূর্বে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলেও বিষয়টি লইয়া আলোচনা হইয়াছিল। তখন জাতিসংঘের বক্তব্য ছিল—বিশ্ববাসীর বৈধতা ব্যতীত গোলান মালভূমির উপর ইসরায়েলের মালিকানা দাবি অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। কিন্তু জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়া পরাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের মতো করিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইহা নূতন কিছু নহে। পরাশক্তিদের এই ‘জোর যাহার মুল্লুক তাহার’-নীতি যতদিন বজায় থাকিবে ততদিন এই বিশ্বের নানা প্রান্তে অশান্তির বিষবাষ্পও ঘুরপাক খাইতে থাকিবে।