সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যা দরকার

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ২২:২৩

সাধন সরকার

সড়কে মৃত্যুর মিছিলের প্রতিবাদ জানাতে থেমে থেমে আন্দোলন গড়ে উঠছে আর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসছেন, বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় বলি হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। বহুবার ফিটনেসবিহীন যান, রুট পারমিট নেই এমন যান ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে এসব যানবাহন চলে কী করে? ঢাকঢোল পিটিয়ে গত সাত মাসে রাজধানীতে তিন দফায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা কর্মসূচি পালন করেছে পুলিশ। কিন্তু তারপরও কি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো গেছে?

তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে চালকদের বেপরোয়া যানবাহন চালানো। এছাড়া রয়েছে চালকদের নিয়ম-কানুন মানাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা, গাফিলতি ও অন্যায় করে চালকদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। এক তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশের সমান। তাই এ খাতটিকে নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। এ খাতে সব ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও পেশিশক্তির অবসান ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। পরিবহন খাতেও সঠিক তদারকি, মনোযোগ ও আন্তরিকতা দেখালে এ খাতটি সঠিক পথে ফিরে আসবে। দুঃখের বিষয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ খাতটিকে যতটা জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখা হয়, আমাদের দেশে সেভাবে দেখা হয় না! বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও চালকের আইন মানার বিষয়টি এখনো অবহেলিত রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিকরাও সড়ক দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। মালিক ও চালকদের অতি লোভ পরিহার করতে হবে। মালিকপক্ষকে চালকদের স্বাভাবিক বিশ্রাম দিতে হবে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ, আইনের প্রয়োগ, মালিকপক্ষের দায় ও জবাবদিহিসহ চালকদের মধ্যে আরো বেশি সতর্কতা ও ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করা গেলে সড়ক নিরাপদ থাকবে বলে মনে করি।

ঢাকা মানেই যেন যানজট, বেহাল সড়ক! পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করাই ধীরে ধীরে ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী এক শহরে পরিণত হয়েছে। রাজধানীতে সড়কে মৃত্যুর অন্যতম কারণ একাধিক কোম্পানির বাসের বেপরোয়া চলাচল। বিভিন্ন সময় ঢাকার রাস্তায় বিক্ষিপ্তভাবে বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি কোম্পানির হাতে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটগুলো একসময় ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আর আলোচনা হয়নি। এটা করা গেলে গাড়ির বেপরোয়া চলাচল কমে যেত।

একের পর এক উড়ালসড়ক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতেও সড়কে শৃঙ্খলা ও যানজট কমানো যায়নি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে। এগুলো হলো—লেন মেনে গাড়ি চালানো, ১৫ বছরের বেশি বাস-মিনিবাস তুলে দেওয়া, স্কুলবাস চালু করা, পথচারীদের ফুটপাত, আন্ডারপাস ও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে উত্সাহিত করা, যততত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করা, গাড়ি চালানোর সময় সিটবেল্ট বাঁধা ও মুঠোফোনে কথা না বলা ইত্যাদি। এমন সব বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তা মানা হচ্ছে কই! এছাড়া ঢাকার রাস্তায় পরিবহন ও মিনিবাস সেক্টরে চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়! সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার রাস্তায় পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠানকে (প্রায় ৩০টিরও বেশি) সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় নেওয়া উদ্যোগ ও সড়ক আইনের ধারাবাহিক অনুশীলনের ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।

ঢাকা