একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত মামলার এজাহারনামীয় আব্দুল আলী মোল্লা (৭৫) নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার দুপুরে এনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বাগেরহাটের চার যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা পেয়ে মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাটের কচুয়া থানা পুলিশ আব্দুল আলী মোল্লাকে তার উদানখালি গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। আব্দুল মোল্লাকে রাতেই ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধী আব্দুল আলী মোল্লা বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের উদানখালি গ্রামের প্রয়াত হোসেন উদ্দিন মোল্লার ছেলে।
এর আগে গত বছরের ১৬ জুলাই বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাঁতি গ্রামের প্রয়াত মোক্তার আলী খানের ছেলে খান আকরাম হোসেন (৬০), একই উপজেলার চাপড়ি গ্রামের শেখ মোহম্মদ উকিল উদ্দিন (৮২), ইদ্রিস আলী মোল্লা (৬৪) এবং একই উপজেলার উদনখালি গ্রামের মো. মকবুল মোল্লা (৭৯) নামে চারজনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মামলার নথির বরাত দিয়ে কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবিরুল ইসলাম সকালে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল আলী মোল্লাকে তার গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আব্দুল মোল্লা ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ সকাল ১০টার দিকে একই এলাকার উকিল উদ্দিন মাঝীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে বাড়ির সামনে উদানখালী কাঠেরপুলের উপর নিয়ে নির্যাতন করে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এঘটনার প্রায় চার দশক পর ২০০৯ সালের ২৮ জুন উকিল উদ্দিন মাঝীর স্ত্রী ফতেমা বেগম বাদী হয়ে কচুয়া থানায় চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলাটি তদন্ত করে। তাদের প্রাথমিক তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলায় সংশ্লিষ্ট আদালতে এই আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চাওয়া হয়। অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। আব্দুল মোল্লাকে রাতে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এছাড়া এই আসামীদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় (মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত) বাগেরহাটের কচুয়া ও মোরেলগঞ্জ উপজেলায় গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল বাগেরহাটের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে এসব আসামির বিরুদ্ধে ওই সময়ে সংগঠিত অপরাধের সত্যতা পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে আবেদন করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল শুনানি শেষে ওই আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের তদন্ত কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. হেলাল উদ্দিন মুঠোফোনে দুপুরে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘খান আকরাম হোসেন ও তার সহযোগী সশস্ত্র লোকজন ১৯৭১ সালের ৫ মে কচুয়া উপজেলার শাঁখারীকাঠি বাজারে গিয়ে নিরীহ লোকজনের উপর হামলা চালিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং ৪২ জনকে হত্যা করে। এছাড়া এরা মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগীতাকারী এ সব হত্যাকারী স্থানীয়ভাবে রাজাকার নামে পরিচিত।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে একাত্তরে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাগেরহাট জেলায় মোট ৬৩টি মামলা হয়। মামলাগুলো তদন্ত করে রামপালের ডাকরা গণহত্যা ও কচুয়ার শাঁখারীকাঠি গণহত্যাসহ বেশকিছু রোমমহর্ষক ঘটনা আমলে নেয়া হয়। গত বছর জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে বাগেরহাটের ১৪ রাজাকারকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ জমা দেয়া হয়। আদালত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে শুনানি শেষে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেয়ে পুলিশ বারোজনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে।
ইত্তেফাক/এএসএমইউ
