দুর্গাপুরে সাত দিনব্যাপী কমরেড রাশিমণি স্মৃতি মেলা শুরু

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৬:১৩

টংক ও জমিদার প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলনের অন্যতম মহীয়সী নারীনেত্রী রাশিমণির ৭১ তম মৃত্যুবার্ষিকী। কমরেড মনিসিংহের সহযোদ্ধা শহীদ রাশিমণি‘র মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ৭ দিনব্যাপী মেলা শুরু হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি মঙ্গলবার থেকে ৬ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত মেলার উদ্বোধন করেন নারী নেত্রী কুমুদিনী হাজং। হাজংমাতা রাশিমণি মেলা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামের রাশিমণি স্মৃতি স্তম্ভ প্রাঙ্গণে এ মেলা চলছে।

১৯৪৬ খ্রিঃ ৩১ জানুয়ারি দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে ইষ্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহীনির সশন্ত্র ক্যাম্প স্থাপন করে। এ সশস্ত্র বাহিনী গ্রামে গ্রামে হানা দিয়ে বিদ্রোহী কৃষকদের খুঁজতে শুরু করে। ৩১ জানুয়ারি সকাল ১০ টার দিকে বিরিশিরি থেকে চার মাইল পশ্চিম-উত্তরে বহেরাতলি গ্রামে ইষ্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনী তল্লাসী করতে যায়।

টংক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী নেতৃস্থানীয় লংকেশ্বর হাজং, গজেন্দ্র হাজং, ও ইসলামেশ্বর হাজংকে সশস্ত্র বাহিনী সেদিন খোঁজ করে। এদের বাড়িতে না পেয়ে সশস্ত্র বাহিনী লংকেশ্বর হাজং এর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওনা হয় তারা। কুমুদিনী হাজং এর বাড়ির এক মহিলা পাশের বাড়িসহ এলাকার অন্যান্য বাড়িতে দৌড়ে গিয়ে খবর পৌছে দেয়।

হাজং গ্রামগুলোতে খবর ছরিয়ে পড়লে শতাধিক হাজং নারী পুরুষ সশস্ত্র বাহিনীর পথরোধ করে কুমুদিনী হাজংকে ছেড়ে দিতে বলে। ইষ্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনী কুমুদিনী হাজংকে না ছেড়ে ক্যাম্পের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে সে সময় রাশিমনি হাজং এর নেতৃত্বে দিস্তামনি হাজং, সভামতি হাজং,রনেবালা হাজং,প্রভাতি হাজং,পঞ্চমনি হাজংসহ ১২জন হাজং মহিলা এগিয়ে আসেন। অগ্রভাগে গিয়ে কুমুদিনী হাজংকে ছাড়িয়ে নিতে এগিয়ে গেলে সশস্ত্র সেনারা নৃসংশভাবে গুলি চালায়।

এতে রাশিমনি গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পেছনে পুরুষ দলের নেতা সুরেন্দ্র হাজং রাশিমনিকে ধরতে গেলে তাকেও নির্দয়ভাবে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় অন্য হাজংরা ক্ষিপ্ত হয়ে ইষ্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।

ক্ষিপ্ত হাজং পুরুষদের বল্লমের আঘাতে ঘটনাস্থলেই রাইফেল বাহিনীর দুজন সেনা নিহত হন। এদিকে অন্যান্য হাজংরা কুমুদিনী হাজংকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

কৃষক নারীদের মধ্যে শহীদ হিসেবে রাশিমনি হাজং এর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হলো। রাশিমনি শহীদ হওয়ার একমাস পড়েই স্ত্রী বিয়োগে কাতর রাশিমনির স্বামী পাঞ্জী হাজং আগুনে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহুতি দেন।

নিঃসন্তান হয়েও হাজংদের অধিকার ও নারী সংগ্রামের প্রতীক রাশিমনি হাজং তার সম্প্রদায়ে হাজং মাতা হিসেবে খ্যাত হন।

হাজংমাতা রাশিমণি মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট এর চেয়ারপার্সন খুশি কবীর এর নেতৃত্বে বহেড়াতলী গ্রামে শহীদ রাশিমণি‘র স্মৃতি স্তম্ভ নির্মিত হয়। প্রতি বছর এই দিনে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।

সাত দিনব্যাপী উক্ত কর্মসূচীর প্রথম দিন মঙ্গলবার স্মৃতিসৌধে শহীদের স্মৃতির প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সুশীল সমাজের ব্যাক্তিবর্গের পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমার সভাপতিত্বে সুজন হাজং এর সঞ্চালনায় শহীদের জীবনীর উপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন স্থানীয় এমপি ছবি বিশ্বাস, বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ হক, আদিবাসী ইউনিয়ন এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আদিবাসী গবেষক ও লেখক খগেন্দ্র হাজং, প্রেসক্লাব সভাপতি নিতাই সাহা, সিপিবি উপজেলা কমিটির সম্পাদক আলকাছ উদ্দিন মীর, উপজেলা কৃষকলীগ সম্পাদক স্বপন হাজং, আদিবাসী নেতা মতিলাল হাজং প্রমুখ।

ইত্তেফাক/এএন