হিমায়িত খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ছে

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৯:২৩
 
সময়ের সাথে সাথে আমাদের জীবনধারাতে নানা পরিবর্তন আসছে। খাদ্যাভ্যাসও বদলে যাচ্ছে ক্রমেই। নাগরিক জীবনে ব্যস্ততার চাপ সবাইকে কোণঠাসা করে তুলছে ব্যস্ত জীবন। অফিস শেষে বাসায় ফিরে বাজারে যাওয়া, পছন্দের জিনিস কেনা। তার ওপর আবার রান্না করা। আবার অনেক সময় বাসার চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে না। এর মধ্যে বাসায় অতিথি এলে তো ঝামেলা আরো বেড়ে যায়। তেমন প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতিতে ব্যস্ত নগর জীবনে সকাল ও বিকেলের নাশতা তৈরির ঝামেলা থেকে বাঁচতে এখন অনেক বাসাতেই প্যাকেটজাত রুটি পরোটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে প্যাকেটজাত হিমায়িত খাবার। সবাই এখন সময়ের সীমাবদ্ধতাকে কাটাতে নানা উপায় খুঁজে বের করছেন। জীবন যাপনের পরিবর্তন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় হিমায়িত খাবারের প্রতি মানুষের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। আগে এসব খাদ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন দেশেই বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উত্পাদন ও বাজারজাত করছে। বাজার ধরতে এসব প্রতিষ্ঠান এখাতে বড় অংকের বিনিয়োগও করছে।
 
হিমায়িত খাদ্যপণ্য মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এগুলো হলো: পরোটা, স্ন্যাক্স ও মাংসের তৈরি খাদ্যপণ্য। মাংসের তৈরি খাদ্যপণ্যের বেশির ভাগই মুরগি থেকে তৈরি করা হচ্ছে। মাছের তৈরি খাবারের কিছু আইটেমও পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এখন ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে এসব খাবার বাজারজাত করছে। এই খাদ্যপণ্যের তালিকায় রয়েছে নানা মুখরোচক খাবার। রুটি, পরোটা, সিঙ্গাড়া ডালপুরি, আলুপুরি, সমুচা, রোলসহ মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি নাগেটস, চিকেন সসেজ, মিটবল, স্প্রিংরোলসহ প্রভৃতি খাদ্যপণ্য চমত্কার প্যাকেটে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সুপারশপ এবং অলিগলির বড় বড় দোকানে। হিমায়িত খাদ্যপণ্যের ক্রেতার সংখ্যা দিনে বৃদ্ধি পাওয়ায় আজকাল অনেক দোকানদার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে দোকানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হিমায়িত খাদ্যপণ্য সামগ্রী রাখছেন। বিভিন্ন কোম্পানির এক প্যাকেট সিঙ্গাড়া বা সমুচা সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ২০টি পরোটার একটি প্যাকেট বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। চিকেন নাগেট, মিটবল, ফিসবল, কাটলেট, স্প্রিংরোল, চিকেন রোল, ভেজিটেবল রোল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ইত্যাদি আইটেমগুলো প্যাকেটের আকার ভেদে বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়।
 
দেশে হিমায়িত খাদ্যপণ্য বাজারজাত করছেন এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে গোল্ডেন হারভেস্ট, কাজি ফার্মস, ব্র্যাক চিকেন, আফতাব ফুডস, আইজি ফুডস, রিচ ফুড, প্রাণ আরএফএল, সিপি, এজি গ্রুপ, প্যারাগন উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশে হিমায়িত খাদ্যপণ্যের বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে এখন হিমায়িত খাদ্যপণ্যের বাজারের আকার ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিছু কিছু কোম্পানির হিমায়িত খাদ্যপণ্য বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাদের বিক্রি বাড়ছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হারে। বিভিন্ন সুপারশপে হিমায়িত খাবার ছাড়াও প্যাকেট করা কাটা সবজি, মুরগির মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের পিঠাজাতীয় খাবারও পাওয়া যায় এখন। পুডিং, তেলে ভাজা ও নকশা করা পিঠা, মুখরোচক বিভিন্ন স্বাদের হালুয়া ও মিষ্টির চাহিদাও অনেক। এগুলো সাধারণত ঘরে তৈরি করে দোকানে দোকানে বিক্রির জন্য দিয়ে থাকে অনেক নারী উদ্যোক্তা।
 
মূলত মানুষের ব্যস্ত জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে এখন অনেকেই তৈরি হিমায়িত খাদ্যের প্রতি ঝুঁকছেন। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করে এ ধরনের হিমায়িত খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা রাজধানী ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ না রেখে ্ইতোমধ্যে দেশের বড় বড় শহরে সম্প্রসারণ করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের হিমায়িত খাবার সামগ্রী বিক্রির জন্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিজস্ব আউটলেট খুলেছে। পাশাপাশি সুপারশপ ও সাধারণ মুদি দোকানে তাদের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ভালোমানের কারণে বেশ কিছু ব্র্যান্ড ক্রেতাদের আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করেছে এর মধ্যেই। হিমায়িত খাবার বাজারজাতকরণের সময় প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোকে যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অবশ্যই মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন দোকানে বিক্রির জন্য রাখা পণ্যসামগ্রীগুলো সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কিনা, বিক্রির সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন দোকানে মেয়াদ উত্তীর্ণ হিমায়িত খাদ্যপণ্য বিক্রির জন্য রাখা না হয় সে ব্যাপারে সাবধান করতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক উপাদান, প্রিজারভেটিভ যাতে হিমায়িত খাদ্য তৈরির সময় ব্যবহূত না হয় সে বিষয়ে বিএসটিআই এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরী কর্তৃপক্ষকে কড়া নজরদারি করতে হবে। হিমায়িত খাদ্যপণ্যকে সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রস্তুতের পর খুচরা বিক্রেতা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহের ব্যবস্থা  (কোল্ড চেইন) ঠিক রাখতে হবে।
 
দেশের প্রস্তুত হিমায়িত খাদ্যপণ্যের বাজার এখন আর দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেশে প্রস্তুত হিমায়িত খাদ্যপণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে প্রস্তুত হিমায়িত খাদ্যপণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন। বিদেশি ক্রেতাদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করতে হবে। রুচি ও স্বাদের বৈচিত্র্য ধরে রাখতে হবে। আমাদের দেশে সব ফলমূল,শাকসবজি প্রভৃতি উত্পাদিত হয় সেগুলো বৃহত্ পরিসরে উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত উত্পাদন বৃদ্ধি করার জন্য সঠিক পদ্ধতি, নির্ভুল জ্ঞান ও গবেষণায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত এই সেক্টরে বিনিয়োগের স্বচ্ছ কোনো ব্যবস্থা নেই। যদি একজন কৃষক কোনো খামার করতে চায় তাহলে এটার জন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন চাষি তা সঠিকভাবে সরবরাহ পায় না এবং যে পদ্ধতিটা বিদ্যমান তা অনেক দীর্ঘ ও ঝামেলাযুক্ত। তাই চাষিরা এ ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এক্ষেত্রেও মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশির ভাগ লাভটা নিয়ে নেয় আর কৃষক ও ভোক্তারা মধ্যে থেকে কিছুই পায় না। তাই এ ব্যাপারটারতে সরকারের সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত।  যদি আমরা খাদ্য উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের এ ব্যাপারটাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি, জাতি বেকারত্ব নামক অভিশাপ হতে মুক্ত হবে এবং দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর ধাপটাকে অনেকাংশেই বলিষ্ঠ করতে পারবে।