ডিমের প্রতি ছোটবেলা থেকেই হিরুর অদম্য লোভ! বলা হয়, ডিমে অধিকাংশ খাদ্য পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। তবে যা বলা হয় না, কিন্তু চরম বাস্তব—ডিমের মধ্যে ‘ডিম্ব’ও বর্তমান! আজ হিরুর জীবনে ডিমঘটিত কয়েকটি কাহিনি শোনাতে চাই আপনাদের...
হিরুর ছোটবেলাকার কথা। তার মা মুরগি পুষতেন। তার ইচ্ছে ছিল, ডিম দিলে মুরগিগুলোকে তিনি বাচ্চা ফুটানোর উদ্দেশ্যে বসাবেন। কিন্তু হিরুর কারণে তা (উম) দেওয়ার জন্য ডিম রাখতে পারতেন কই! মামলেট, অমলেট, হাফ বয়েল, ফুল বয়েল—কত কত ভাবেই না হিরু সেই ডিমগুলোকে পেটে চালান করে দিত। একদিন তো এমনটা দেখা গেল, বাসায় কোনো ডিম নেই, কিন্তু হিরু মুরগির খোয়াড়ের পাশে বসে আছে! অবস্থা এমন—মুরগি এখন যেই ডিমটা পাড়বে, সেটাকে সে মাটিতে পড়তে দেবে না, সরাসরি পেটে চালান করে দেবে!
হিরুর মায়ের কড়া আদেশ, অন্যান্য দিনে হিরু ডিম খাক বা না-খাক তাতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু পরীক্ষার দিনে তাকে ডিম খেতেই হবে! তার যুক্তি, পরীক্ষার সময় ছেলে-পেলেদের মস্তিষ্ক কাজ করতে চায় না। এ সময়ে তাকে একমাত্র বন্ধুর মতো সাহায্য করতে পারে ডিম! কিন্তু অন্যান্য দিনে এক ডজন পর্যন্ত ডিম গলাধঃকরণ করলেও পরীক্ষার দিনে ডিম খেতে হেভভি অ্যালার্জি হিরুর। সেই ঐতিহাসিক কথাই তার মুখে রেডিওর মতো বাজে—ডিম খেলে পরীক্ষার খাতায় ডিম পেতে হয়!
‘তাতে সমস্যা নাই!’ মায়ের এই কথার প্রেক্ষিতে হিরু একবার পরীক্ষার খাতায় কিছুই না লিখে এসেছিল। শূন্য তথা ডিম পেয়ে মাকে হাতে-কলমে ‘পরীক্ষার দিনে ডিম খাওয়া’র কুফল দেখিয়ে দেবে! কিন্তু সেবার ঘটল অন্য ঘটনা। পুরো খাতা ফকফকা রেখে জমা দিলেও হিরু একেবারে ডিম তথা শূন্য পেল না। শিক্ষক তাকে দশ মার্কস প্রদান করেছেন। বহুকষ্টে হিরু এর রহস্য উন্মোচন করল—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পুরো পাঁচ নম্বরই পেয়েছে সে! তাহলে, বাকি পাঁচ নম্বর কোত্থেকে এলো? সাহস করে শিক্ষককে এই প্রশ্ন করাতে তিনি বিগলিত হাসি হেসে বললেন, ‘তোমার ওই সাদা খাতার বদান্যতায় আমি প্রত্যহ বাজারের চোতা লেখার সুযোগ পাচ্ছি। জানোই তো, আমার যা ভুলো মন! লিস্টি করে বাজারে না গেলে কোনো কিছুই ঠিকঠাকমতো আনতে পারি না। দশের বাকি পাঁচ তোমাকে খুশি হয়ে দেওয়া, বলতে পার—বোনাস!’
বোনাসের কথা বলতেই হিরুর মনে পড়ল—একবার এই শিক্ষকই তাকে সাড়ে ঊনআশিতে আটকে দিয়েছিলেন। তখন পয়েন্ট ফাইভ জিরোর (.৫০) জন্য তার ‘এ’ প্লাসটা পাওয়া হয়নি। সবচেয়ে মজার ঘটনা, আগের পরীক্ষায় সাড়ে ঊনআশি পাওয়া ছাত্রটি কিভাবে দশ পেল, এই নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই!
পরীক্ষার খাতায় ডিম পেতে ব্যর্থ হয়ে হিরু ঘোষণা দিল—আর কখনো পরীক্ষার দিনে ডিম খাবে না সে। অবশ্য ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বাসায় নোটিসবোর্ড টাঙিয়ে তাতে লিখেও দিয়েছে। পরে পরীক্ষার দিনে মা তাকে কয়েকবার জোর করে ডিম খাওয়াতে চেয়েও পারেননি। বাসার সবাই-ই এখন জানে, হিরু পরীক্ষার দিনে ডিম খায় না। তারপরই ঘটল ভিন্ন ঘটনা। বাসায় হিরুর মতোই আরেক ডিমখোরের আবির্ভাব ঘটল। সে বেছে বেছে হিরুর পরীক্ষার দিনগুলোতে ‘হিরুর ডিম না খাওয়া’র সুযোগ নিয়ে গোপনে সব ডিম সাবাড় করতে লাগল। মা পড়ে গেলেন মহা টেনশনে। ‘হিরু ডিম খায় না। তাহলে কে খায় ডিমগুলো?’ তার মনে কখনো এমন সন্দেহই জাগেনি, ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষার দিনে গোপনে স্বয়ং হিরুই ডিম সাবাড় করছে!
হিরুর ‘ডিম’ বিষয়ক অত্যাচারে তার মা হুলিয়া জারি করলেন। ডাক্তারি বার্তা প্রচার করতে লাগলেন তিনি, রোজ একটার বেশি, সপ্তাহে ছয়টার বেশি ডিম খাওয়া উচিত নয়। তাতে নাকি ক্যান্সার ইত্যাদি ইত্যাদি রোগব্যাধির আশঙ্কা থাকে! তার এই প্রচারে ঘরের অন্যান্য সদস্যরা ডিম খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিলেও হিরুর কমল না। শেষমেশ তার মা ডিমগুলোকে তালা দিয়ে রাখতে বাধ্য হলেন!
ওদিকে, হিরুদের স্কুুলে এক নতুন টিচার এসেছেন। শহরের এক নামকরা স্কুলে কিছুকাল পড়িয়েছেন তিনি। সেই গর্বে তার পা মাটিয়ে পড়ে না। ‘এই গেঁয়ো-সেকেলে ছাত্রছাত্রীরা আর কী জানবে! এদের মস্তিষ্ক তো সব গোবরে ভরা!’ এমন ধারণা তার। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল এক আজিব কারবার। গণহারে ছেলেপেলেরা সব গোল্লা আইমিন শূন্য পেয়েছে! পরেরবারও একই ঘটনা। পরীক্ষার খাতায় এভাবে গোল্লা প্রাপ্তিতে ছাত্ররা হতাশ! অন্যদিকে, স্যার বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলেন, ‘গোল্লা পেয়েছ। রসগোল্লা ভেবে খেয়ে ফেল!’
শেষমেশ হিরুর সেই গোপন ইচ্ছেটিও পূরণ হলো। সেবার চেষ্টা করেও শূন্য পায়নি, স্যার তাকে দশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার ভালো লিখলেও এই স্যার তাকে গোল্লা দিয়েছেন। যখন খাতাটা হাতে পেল, গোল্লাটার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে রইল সে!
‘এটা কী?’ বিড়বিড় করে বলল সে। ‘স্রেফ গোল্লা? নাকি বৃত্ত? না, বৃত্ত হয়নি। একেবারে গোল নয়, তাহলে বলও নয়। তাহলে? কমলালেবু? পৃথিবী নাকি কলমালেবুর মতো! তাহলে কি স্যার তার খাতায় পৃথিবীর মানচিত্র এঁকেছেন? নাকি সৌরজগত্ কিংবা বিশ্বজগতের কোনো গ্রহ? নাকি... নাকি...’
শেষমেশ হিরু আবিষ্কার করল—এটা ডিম!
অমনি কে পায় তাকে! চিক্কুর দিয়ে পুরো ক্লাস মাথায় তুলল। স্যার অবাক। গোল্লা পেয়ে তার ‘জনৈক’ স্টুডেন্ট আনন্দে লাফাচ্ছে! ‘বোকারাম কি তবে সত্যিকারের গোল্লা ভেবে খাতার পৃষ্ঠাই খেয়ে ফেলেছে!’
অন্যদের পুরো দৃষ্টি ততক্ষণে হিরুর দিকে। হিরু শূন্য পেয়েছে দেখে তারাও আনন্দিত। এই প্রথম হিরু গোল্লাক্লাবে নাম লিখিয়েছে। তাকে নবীণবরণ দিতে হবে না!
কিন্তু হিরুর কথা শুনে তারা চমকে গেল। এটা নাকি রসগোল্লা নয়, ডিম!
এ আবার কেমন কথা! স্যার তাদেরকে গোল্লা দিলেও হিরুকে কেন ডিম্ব দিতে যাবেন? নাকি, এটাও হিরুর প্রতি তার এক্সট্রা খাতিরদারির নমুনা! সাদা খাতা জমা দিয়েও হিরুর সেই দশ মার্কস প্রাপ্তিকে ছাত্ররা অন্যভাবে নিয়েছে। তারা ধরেই নিয়েছে, এতকাল হিরু যা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে, তার থেকে দশ মার্কস করে বেশি পেয়ে এসেছে! হিরু অমুক সাবজেক্টে হিরু আশি পেয়েছিল, তাহলে ওটা আশি নয়, সত্তর হবে! বৈষম্য হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ায় ছাত্ররা এবারে আন্দোলনে নামল। তাদের ‘কেউ পাবে ডিম, কেউ গোল্লা; তা হবে না, তা হবে না!’ স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল ক্লাসরুম। এমন হট্টগোলের মধ্যে আরেকজন আবিষ্কার করল, শিক্ষক মশাই তার খাতায় দুটো ডিম এঁকেছেন, আই মিন স্যার তাকে ‘ভালোবেসে’ দুই পিচ ডিম দিয়েছেন! মুহূর্তেই হিরুর প্রতি যেই ক্ষোভটা ছিল, তা দিক পরিবর্তন করে তার দিকে কনভার্ট হলো। ক্লাসের ফার্স্টবয় সে। সবার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল—ফার্স্টবয় দেখেই স্যার তাকে জোড়া ডিম উপহার দিয়েছেন। বাজারে ডিমের দাম চড়া। অন্যরা যেখানে টেনেটুনে একটা ডিম পায়, সে কেন দুটো পাবে!
শিক্ষার্থীরা খারাপ রেজাল্ট করলে দিনশেষে শিক্ষকেরই লাভ! কেননা, গণহারে সবাই তখন সেই শিক্ষকের নিকট পড়তে যায়। শহর ফেরত শিক্ষক মশাইও মফস্বলের এই স্কুুলটিতে চাকরি করতে আসার প্রথম দিকেই তার বাসার একটা কক্ষ প্রাইভেট পড়ানোর জন্য সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখেন। কিন্তু অদ্যাবধি তার বাসায় ছাত্রদের টিকিটিরও দেখা মেলেনি, বড়জোর সিলিংয়ে, আড়ালে-আবডালে দু-একটি টিকটিকির খোঁজ মিলতে পারে! কিন্তু, এদ্দিনে সবার বোধোদয় হয়েছে। সুরসুর করে ক্লাসশুদ্ধ সব স্টুডেন্ট তার কাছে পড়তে এলো।
স্যার ভাবলেন, যারা শূন্য পায়, তাদেরকে শূন্য অর্থাত্ একেবারে গোড়া থেকেই পড়ানো শুরু করা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথম দিনে তিনি তাদেরকে যোগ-বিয়োগ শেখাতে লাগলেন। ‘ধরো, তোমাকে আমি প্রথমে দুটো কুকুর দিলাম। তারপর আরও দুটো দিলাম। তাহলে তোমার কাছে কতগুলো কুকুর হবে?’
ফার্স্টবয় উত্তর দিলো, ‘পাঁচটি, স্যার।’
স্যার বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘ক্লাসের ফার্স্টবয়েরই যদি এমন বেহালাবস্থা হয়, তাহলে সবাই তো পরীক্ষার খাতায় ডিমই পাবে!’
ফার্স্টবয়টি বিড়বিড় করে বলল, ‘ভুল কি বললাম, স্যার! আপনার দেওয়া চারটি কুকুরের সাথে আমার টবিকে (কুকুর) যোগ করবেন না?’
কিংকতর্ব্যবিমূঢ় শিক্ষক এবার গোঁ ধরলেন। মনে মনে জেদ করলেন তিনি, ‘ চান্দুরা, প্রাইভেট পড়তে আসলেও তোমাদের ডিম পাওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না!’
পরের পরীক্ষা শুরুর আগের ঘটনা। সেটা ছিল শেষ ক্লাসের দিন। ছাত্ররা আগে থেকেই ভয়ে চুপসে আছে, সেই স্যার যদি এবারও সবাইকে গোল্লা দিয়ে দেয়! ‘কিছু একটা করতেই হবে!’ এই ভাবনা থেকেই তারা বুদ্ধি বের করল। স্যারের বাসায় তারা পালাক্রমে পুরস্কার (ঘুষ) হিসেবে ডিম পাঠাবে। তবুও, তাদেরকে যেন পরীক্ষার খাতায় ডিম দেওয়া না হয়। স্যাম্পলস্বরূপ একটা ডিমও তারা কিনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো—বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা কে বাঁধবে? অন্যদিকে, হিরুর পরীক্ষার খাতায় ডিম পেতে ভালোই লাগে! পুরো পরিকল্পনা থেকে তাই তারা হিরুকে বাইরে রেখেছিল। শেষমেশ বুদ্ধি আঁটল—ঘণ্টাটা আই মিন ডিম দেওয়ার অফারটা তারা হিরুকে দিয়েই দেওয়াবে। সেই মোতাবেক গোপনে হিরুর ব্যাগে ডিমটা রেখে দিয়েছে। হিরুকে ব্ল্যাকমেইলও করেছে—হিরু স্যারকে না বললে তারা তার ব্যাগ থেকে এই ডিমটা বের করে স্যারকে বলবে, ‘স্যার আপনার দিকে নিক্ষেপ করার জন্য হিরু এই ডিমটা স্কুলে নিয়ে এসেছে!’ কী এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থাই না হবে তখন! হিরুও সবার প্ল্যান শুনে চুপসে গেল!
সর্বশেষ পিরিয়ডে সেই শহুরে স্যার ক্লাস নিতে এলেন। ঢুকেই সহাস্যে বললেন, ‘যে প্রথম আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, তাকে আগে ছুটি দেব।’
সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক মশাইয়ের সামনে একটা ডিম এসে আছড়ে পড়ল। অবশ্য এমনি ডিম হলে ওটা ভেঙে যেত। ডিমটাকে একটা সাদা প্ল্যাস্টিকের বক্সের ভেতরে রেখে ছুঁড়ে মেরেছে কেউ!
চমকে উঠে শিক্ষক বললেন, ‘এটা কার কাজ?’
হিরু পিঠে ব্যাগ নিয়ে উঠে এসে বলল, ‘আমার কাজ স্যার... থ্যাঙ্ক ইউ। এখন বাসায় গিয়ে এটাকে মজা করে খেতে হবে!’ বলে ডিমটা হাতে তুলে নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল সে।
ততক্ষণে শিক্ষক তো বটেই ক্লাসের সবার চোখ কপালে।
শেষমেশ শিক্ষক মশাই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেন—এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা আসলেই জিনিয়াস!
তারপর থেকে তিনি কখনো তার কোনো শিক্ষার্থীকে শূন্য তো বটেই, ফেলও করাননি! g
