শত বছর পেরিয়েও আলো ছড়াচ্ছে বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:২৭

শহরের প্রাণকেন্দ্রে ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল। ১৮৭৮ সালকে এই বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠা সাল ধরা হলেও এটি এই বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার সাল। প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টির সূচনা হয় ১৮৬২ সালে।

 
পীর হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এর পবিত্র ভূমি, সুন্দরবন অঞ্চলের উপকণ্ঠে ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক নগরী খলিফাতাবাদের (বাগেরহাট) প্রাচীন বিদ্যা নিকেতন বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল।
 
১৮৫৭-৫৮‘র রক্তঝরা দিনগুলোর তখন অবসান হয়েছে। শাসক ইংরেজ সরকার সিপাহী বিপ্লবকে দমন করতে পারলেও এ কথা বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, এ দেশের জনসাধারণের সঙ্গে একটা স্থায়ী যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন তারা। ফলে জেলায় জেলায় দুই একটি স্কুল গড়ে উঠলো। সে পরিকল্পনার ঢেউ বাগেরহাটেও লেগেছিল। তখনও বাগেরহাট একটি শহর হয়ে ওঠেনি, বিরাট কোনো গঞ্জও তখন বাগেরহাট নয়। একটি থানার কেবল পত্তন হয়েছে বাগেরহাটে। রাস্তা ছিল কাঁচা। তখন দক্ষিণাঞ্চলের গঞ্জ ছিল মোড়েলগঞ্জ। লিভারপুল থেকে লবণ আর কাপড়-চোপড়ের সওদা নিয়ে জাহাজ ভিড়ত মোড়েলগঞ্জে। কিন্তু বাগেরহাটের কপাল অবশেষে ফিরলো। ১৮৬৩ সালে ব্রিটিশ সরকার বাগেরহাটকে মহকুমা ঘোষণা করে। ঘটনাটা ১৮৬২ সালেই মানুষ জানতে পেরেছিল। তখন বাগেরহাট শহরে নাম করা কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ছিল না। যেসব অফিসাররা মহকুমায় আসবেন তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়বে কোথায়? অতএব ১৯৬২ সালেই বর্তমান বাগেরহাট কলেজিয়েট স্কুল প্রাঙ্গণে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট মহকুমার কাজকর্ম শুরু হলো। দলে দলে সরকারি কর্মচারীরা এলেন বাগেরহাটে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বন্ধু সাহিত্যিক গৌরদাস বসাক বাগেরহাটে প্রথম মহকুমা প্রশাসক হয়ে এলেন। তারই চেষ্টা এবং স্থানীয় জমিদারদের সহায়তায় ক্রমে ক্রমে উন্নতির পথে অগ্রসর হলো এবং কয়েক বছরের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ে উন্নীত হলো।
 
এরপর ১৮৭৮ সালে তত্কালীন মহাকুমা প্রশাসক রামচরণ বসুর প্রচেষ্টায় ইংরেরি বিদ্যালয়টি রুপান্তরিত হয় উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৭৮ সালের ১৩ জুন স্বীকৃতি আসে। তাই প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে এখনও ১৩ জুনকে স্মরণ করা হয়। ১৮৮৫ সালে তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক নরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর চেষ্টায় স্থানীয় বিদ্যানুরাগীদের অনুদানে আট হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির অবদানে একের পর এক ভবন নির্মিত হয়।
 
বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল এ পর্যন্ত অগণিত প্রসিদ্ধ ব্যক্তিকে সৃষ্টি করেছে। যারা দেশ বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে আলোকিত করেছেন। এর মধ্যে আধুনিক বাগেরহাটের রুপকার হিসেবে খ্যাত প্রাক্তন রাজস্ব সচিব মরহুম সৈয়দ মোস্তাগাউছুল হক, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিব কালীপদ পাল, প্রাক্তন সংসদ সদস্য মীর সাখাওয়াত আলী দারু, বাগেরহাট পৌরসভার মেয়র খান হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
 
অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ১৮৭৮ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটিতে ৪০তম প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০১০ সালের ১৬ মে যোগদান করি। যোগদানের সময় থেকে এখন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এক্ষেত্রে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পৌর মেয়র খান হাবিবুর রহমানের প্রচেষ্টা ও আর্থিক সহযোগিতা ছিল স্মরণীয়। বর্তমানে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছে।
 
পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও বাগেরহাট পৌরসভার মেয়র খান হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যক্তি জীবনে একজন ফুটবল খেলোয়ার হিসেবে অবসর গ্রহণ করে রাজনীতিতে যোগদান এবং পরবর্তীতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হই। এরপর ২০১০ সালে বাগেরহাটের সবচেয়ে প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী বাগেরহাট কলেজিয়েট স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করি। ভবন সমস্যার সমাধান হলে বিদ্যালয়টি দক্ষিণাঞ্চলের মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

ইত্তেফাক/নূহু