দুর্গম এলাকায় আবাসিক স্কুলের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯, ২১:৫৮

সমপ্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বসেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। সেখানে আমাদের সচিবগণ নিজ নিজ মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত জনকল্যাণমূলক নানা প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছেন। তাহাদের নূতন নূতন ও সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনা সত্যিই প্রশংসনীয়। ইহার মধ্যে বিশেষ করিয়া দুইটি প্রস্তাবের ব্যাপারে আমরা গুরুত্বারোপ করিতে চাই। প্রথম প্রস্তাবটি হইল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের। তিনি সেই আলোচনা সভায় বলিয়াছেন, ‘হাওরাঞ্চলের জেলাগুলো বছরের বড় একটি সময় পানিতে ডুবে থাকে। স্কুলে যেতে পারে না বলে অনেক শিশু পড়ালেখাই ছেড়ে দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার রোধ করতে হাওরাঞ্চলে আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ অন্যদিকে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব নূরুল আমিন পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের শতভাগ স্কুলে আনিতে আবাসিক স্কুলের গুরুত্বের কথা তুলিয়া ধরেন। এই দুই সচিবের প্রস্তাবের মর্মকথা একই, তাহা হইল—দুর্গম এলাকায় আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করিয়া শিক্ষায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করা। আমরা এই ধরনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। ইহার বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে দিক-নির্দেশনা থাকিবে বলিয়া আমরা আশা রাখি।

আগামী ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হইবে। এইজন্য এখন হইতেই নানা প্রস্তুতি চলিতেছে। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যেও আমরা হাওর, পাহাড়, চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করিতে পারি নাই। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষাদীক্ষাসহ তাহারা এখনও নানা দিক দিয়া পশ্চাত্পদ। সামপ্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এইসব অবহেলিত জনপদে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগিতে শুরু করিয়াছে। তবে এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা হইল মানব উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই এই ব্যাপারে পিছাইয়া পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তান-সন্ততিদের জন্য বিশেষ যত্ন নেওয়া আবশ্যক। এইসব অঞ্চলে আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হইলে তাহারা স্কুলপ্রাঙ্গণে থাকিয়াই নিশ্চিন্তে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশুনা করিয়া যাইতে পারিবে। এইসব জনপদ যেহেতু পশ্চাত্পদ, তাই ছাত্রছাত্রীদের সুলভ মূল্যে থাকা ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। সেখানে শিক্ষকদেরও আবাসিক সুবিধা থাকা প্রয়োজন। কারণ অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেইসব এলাকায় অনেক শিক্ষকই নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকিতে পারেন না।

এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের হাওর, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় সব মিলাইয়া ২০ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রহিয়াছে। এখানে শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৬ লক্ষ। কিন্তু ইহার অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দিনের পর দিন কোনো ক্লাস হয় না। কোনো কোনো বিদ্যালয় ক্লাসের সময়ও থাকে তালাবদ্ধ। শিক্ষকরা মাসে দুই-একদিন বিদ্যালয়ে হাজির হইয়া হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করিয়া চলিয়া যান। কেহবা আবার প্রক্সি বা প্যারা শিক্ষক দিয়া কাজ চালান। সেইসব এলাকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা থাকিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হইবে না। ইহাতে শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়িবার হার আরো কমিয়া যাইবে। অতএব, দুর্গম এলাকায় আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদেরও সর্বাত্মক চেষ্টা চালাইয়া যাইতে হইবে।