মো. হোসাইন আলম
কিছুদিন আগের শোক কাটিয়ে না উঠতেই আবার শোকের মাতম। চারদিকে আবার ছেলে হারা মা-বাবার কান্না, আবারো ছবি হাতে প্রিয়জনকে ফিরে পেতে জড়ো হয়েছে বিল্ডিং এর পাশে। আবারও টেলিভিশন ও পত্রিকার খবরের শিরোনাম হলো—আগুন, বনানীর এফ আর টাওয়ার-এ।
চারদিকে হাজার মানুষের কান্না। ঢাকার বাতাসে ভেসে আসছে মানুষ পোড়ার গন্ধ, অনেকে জীবন বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি করছে, লাফ দিচ্ছে অনেক উপর থেকে। এ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ঝরছে দেশের প্রতিটি মানুষের।
ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স-এর তথ্য মতে, ২৫০০০০টা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৯৯৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত। এদিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬৪০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৪৮৮টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে যার অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ হলো প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, ২০০৬ সালে ৯১ জন আগুনে পুড়ে মারা গেছে আর আহত হয়েছে ৮৭৩ জন। ২০১৪ সালে ৭০ জন মারা গেছে আর ২১০ জন আহত হয়েছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের অবস্থা তো আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে পুরান ঢাকায় আগুনে পোড়া মানুষগুলোর কবরের মাটি আজও কাঁচা রয়েছে, আমাদের আবার নতুন করে এদের জন্য কবর করতে হবে। এই সমস্ত আগুনের ঘটনার জন্য দায়ী কে? ভবনের মালিক, কর্মকর্তা, রাজউক নাকি ভুক্তভোগী মানুষগুলো।
ঢাকা হলো অধিকমাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ শহর, এক ভবন হতে অন্য ভবনের দূরত্ব দুই-তিন হাতের বেশি নয়। এই ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভবন তৈরি করার জন্য আগে ভাবতে হবে নিরাপত্তার কথা। ঢাকাতে প্রায় ১৮.২৩৭ মিলিয়ন লোক বসবাস করে থাকে। প্রতি কিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জন লোক বসবাস করে থাকে। ২০১৯ সালে লোক বৃদ্ধির হার ৩,৬২ পার্সেন্ট। যা এই বছরের শেষের দিকে হবে প্রায় বিশ মিলিয়ন-এর মত। এই অধিকমাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নিঃশ্বাস নিতে হলে হিসেব করে নেওয়া উচিত যে প্রতিটি মানুষ কতটুকু নিঃশ্বাস নিতে পারে।
অথচ এই ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভবন ও কল-কারখানা তৈরিতে প্ল্যানিং মিসিং অনেক হারে দেখা যায়, যার ফলে একটি দুর্ঘটনা না যেতেই অন্য আরেকটি দুর্ঘটনা এসে আমাদের ঘাড়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে প্রতিটি বিল্ডিং তৈরির আগে উন্নত প্ল্যানিং করা যেতে পারে এবং আবাসিক এলাকা হতে বাণিজ্যিক ভবনগুলো না থাকাই ভালো। প্রতিটা বিল্ডিংয়ে ফায়ার সার্ভিস সিস্টেম চালু রাখা যেতে পারে এবং ইমারজেন্সি দরজার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বসবাসরত মানুষদের ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং দিতে হবে। প্রতিটি বিল্ডিংয়ে একটি ফায়ার এলার্ম পয়েন্ট থাকতে হবে যাতে আগুন ধরার পর মানুষ সেখানেই সমবেত হতে পারে। তবে সমস্যার জন্য যে শুধু প্ল্যানিং কর্মকর্তা দায়ী তা নয়। আগুনের ঘটনার জন্য বসবাসরত লোকের অসচেতনতাই দায়ী। অনেক বাসাতে দেখা যায় একটি ম্যাচের কাঠি খরচ করার ভয়ে সারাদিন গ্যাসের চুলা চালু রাখে। গ্যাস সিলিন্ডার ভালো করে ব্যবহার করতেই জানে না যার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সব জায়গায়।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল সার্ভিস এবং পুলিশ আগুনের ঘটনার জন্য যে দায়িত্বের সঙ্গে এবং ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করে থাকে তা প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। তবে তাদের কাজের বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২টা বিষয়। একটি হলো ট্রাফিক জ্যাম আরেকটি হলো উত্সুক জনতা। ট্রাফিক জ্যামের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো সময়মতো আসতে পারে না। যার ফলে ক্ষতি যা হওয়ার আগেই হয়ে যায়। আর দ্বিতীয় কারণ হলো উত্সুক জনতা। অনেক লোক আছে যারা মোবাইলে সেলফি এবং লাইভ নিয়ে ব্যস্ত যাদের ভিড়ের কারণে উদ্ধারকর্মীরা ভালোভাবে কাজ করতে পারে না।
ঢাকার আরেক সমস্যার নাম হলো ট্রাফিক জ্যাম। অল ব্যাংক-এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন ঢাকায় ক্ষতি হয় ৩.২ মিলিয়ন কাজের ঘণ্টা। গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭কিলোমিটার আর যদি এই ট্রাফিক জ্যাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকে তাহলে চার কিলোমিটার গতি হবে প্রতি ঘণ্টায়। যেটা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক ঝুঁকির কারণ হবে। আগুন ও ট্রাফিক জ্যামের মধ্য দিয়ে আমরা যে হারে অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে যাচ্ছি তার পরিমাণ কিন্তু কম নয়।
n লেখক:পিএইচডি ক্যান্ডিডেট অ্যান্ড টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইনস্টিটিউট অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি অফ ওরোক্লো, পোল্যান্ড
