১৯১৪ সালে মহকুমা শহরে ছয় বিঘা জমির উপর এলাকার নারী শিক্ষার প্রথম শিক্ষাঙ্গন চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সময়কালের মহকুমা প্রশাসক আলিমুজ্জামান খান মেহেরপুর-ঢাকা ভায়া চুয়াডাঙ্গা সড়ক সংলগ্ন চুয়াডাঙ্গা শহরের জনবসতি এলাকায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একই সময় চুয়াডাঙ্গা মুন্সেফ কোর্টের সহকারী জজ মনিন্দ্র নাথ নিজ খরচে নবপ্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে নতুন একটি পাকা ভবন নির্মাণ করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেন স্থানীয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ হায়দার আলী জোয়ার্দ্দার। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালের ১ আগষ্ট বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়। ঐতিহাসিক এই নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কৃতী শিক্ষার্থী এখন ঢাকার একাধিক সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন হয়। একের পর এক নির্মিত হয় নতুন নতুন দোতলা ও তিনতলা পাকা ভবন। সরবরাহ পাওয়া যায় বেঞ্চ ও চেয়ার-টেবিল এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে দুই শিফটে দুই হাজার ১৫০ জন শিক্ষার্থী তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণ করছে। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায়িক শিক্ষা মিলে এখানে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। বিদ্যালয়টিতে তিনতলাবিশিষ্ট একটি, দোতলাবিশিষ্ট দুটি ও একতলাবিশিষ্ট একটি পাকা ভবন রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে প্রধান শিক্ষকের অফিস চেম্বারসহ পৃথক প্রশাসনিক ভবন। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে একটি ডিপ টিউবঅয়েল থাকলেও এর পানি আর্সেনিকমুক্ত না, যা পানের অযোগ্য। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও কর্মচারীসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদেরকে বিশুদ্ধ খাবার পানি পানের জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এদিকে জেলা শহরের সরকারি নারী শিক্ষার প্রতিষ্ঠানটির মোট ৪৯ জনের মধ্যে ২২জন নিয়মিত শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন যাবত্। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে বছরের পর বছর। সহকারী প্রধান শিক্ষক দিয়েই কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সাতটি পদ থাকলেও আছে মাত্র দু’জন।
বিদ্যালয়টিতে একটি গ্রন্থাগার থাকলেও এ যাবত্কালের মধ্যে কোনো গ্রন্থাগারিকের পদায়ন হয়নি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আনা-নেয়ার জন্য বিদ্যালয়ে পাকিস্তান আমলের বরাদ্দ একটি মাইক্রোবাস ছিল। কিন্তু পুরনো ও জরাজীর্ণতার কারণে স্বাধীনতার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতের জন্য বিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত আর কোনো যানবাহন বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। নিজস্ব যানবাহনের অভাবে বিদ্যালয়ের দূর-দূরান্তের নারী শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী কলেজে উন্নীত করা একান্ত অপরিহার্য। চুয়াডাঙ্গার দুই কৃতী সন্তান এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান অধ্যাপক ডা. ফেরদৌস আরা ও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শোহদা খাতুন তাদের ফেলা আসা স্কুলজীবনের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়টিকে সময়ের প্রয়োজনে এখনই কলেজে উন্নীতকরণে সরকারের প্রতি বাস্তব ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।
ইত্তেফাক/নূহু
