এবার গুলশানে বাজারে আগুন

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯, ২২:৪০

বনানী অগ্নিকাণ্ডের ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই গুলশান ১ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেট লাগোয়া কাঁচাবাজারে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটলো। শনিবার ভোর পৌনে ৬টার দিকে শুরু হওয়া আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এ আগুনে কাঁচাবাজারের ১৮৮টি দোকান ভস্মীভূত হয়েছে। কাঁচাবাজারের সামনের পাঁচতলা গুলশান শপিং সেন্টারের তিনটি দোকানও পুড়ে গেছে। আগুনে ব্যসায়ীদের কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেলেও কেউ হতাহত হয়নি। তবে আগুন নেভাতে গিয়ে কয়েকজন সামান্য আহত হয়েছেন। দুই বছর আগে ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি এই একই মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬০০ দোকান পুড়ে গিয়েছিল।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের আরো ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। ২০টি ইউনিটের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও যোগ দেন আগুন নেভানোর কাজে। আগুনের তিব্রতা বেড়ে কাঁচাবাজারের সামনে গুলশান শপিং সেন্টারেও ছড়িয়ে পড়ে। ওই মার্কেটের দোতলায় হার্ডওয়্যার ও খাবারের কয়েকটি দোকান পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে তখনও কাঁচাবাজার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। পরে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে কীভাবে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ধারণা, বাজারের সুগন্ধীর কোনো দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

এদিকে আগুন নেভাতে গিয়ে উত্সুক জনতার প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। পরে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে উত্সুক জনতাকে সরিয়ে দেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণে সকাল থেকে মহাখালী, পুলিশপ্লাজা ও গুদারাঘাট থেকে গুলশান ১ নম্বর পর্যন্ত সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অগ্নিনির্বাপক গাড়ি ও জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করা গাড়িগুলোকে চলতে দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘এই মার্কেটে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। আগেও আগুন লেগেছিল এ মার্কেটে। তখন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তিন থেকে চার বার মার্কেট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কোনো নোটিশ মার্কেট কমিটি বাস্তবায়ন করেনি। এসব কারণে আগুনের ভয়াবহতা দ্রুত বেড়েছে।’ তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তদন্ত সাপেক্ষে আমরা এটা বলতে পারব। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মো. শামীমকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপ কাঁচাবাজার

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গুলশান এক নম্বর ডিএনসিসি মার্কেটের দোতলা ভবনের পূর্ব পাশ ঘেঁষে লোহার কাঠামোর উপর টিন আর লোহার রড দিয়ে গড়ে উঠেছে এই কাঁচাবাজার। এখানে মাছ-মাংসের দোকানের পাশাপাশি মুদিখানা, ক্রোকারিজ ও সুগন্ধীর দোকান ছিল। মার্কেটটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বহু ব্যবসায়ীর স্বপ্ন। অনেকের পুড়েছে কষ্টার্জিত শেষ সম্বল। সেখানে পড়ে রয়েছে শুধু পুড়ে যাওয়া পণ্যের ছাই। কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই দোকানের। আবার কোনো দোকানের সামনে পড়ে আছে আলু, পেঁয়াজ। পুড়েছে মাছ, মুরগিও। কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নির্বাক হয়ে দোকানের সামনে বসে আছেন।

বাজারের একটি দোকানের মালিক শাহদাত হোসেন বলেন, আগুন লাগার ঘটনাটি ভোরে ঘটেছিল বলে এখানে তেমন কেউ ছিল না। মার্কেটের পূর্ব পাশে হঠাত্ করে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। সেখানে সুগন্ধির দোকান রয়েছে। সেখান থেকে আগুন লাগে বলে তারা শুনেছেন। তবে শহিদুল ইসলাম নামের আরেক দোকানি বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, মার্কেটের মাঝামাঝি আব্দুল্লাহ আওয়ালের পানের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। পরে আশপাশের দোকানে তা ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে তার ৩টি দোকানের ৮৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে বলেও দাবি করেন। মো. হাসান, শরিফুলসহ কয়েকজন দোকানি জানান, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে শহিদুল ইসলাম, মিজান, ইকবালসহ কয়েকজন দোকানির ধারণা, এ ঘটনা নাশকতাও হতে পারে। এখানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ নিয়ে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী দাবি করেন, এর আগেও মার্কেটে আগুন লেগেছিল। ফের আগুন লাগার কোনো কারণ জানা নেই তাদের। কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগাতে পারে। এ সময় আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী একই দাবি করেন। তবে তারা কেউই বলতে পারেননি কে বা কারা পরিকল্পিতভাবে মার্কেটে আগুন দিতে পারে।

ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই

মার্কেটের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের ক্রোকারিজের তিনটি দোকানই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দোকানে প্রায় ৮০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। দেশের নামি-দামি তারকাচিহ্নিত হোটেলে পণ্য সরবরাহ করতেন হাবিব। বিদেশি পণ্যই বেশি ছিল তার দোকানে। ২০১৭ সালের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে দাঁড় করিয়েছিলেন তার ব্যবসা। এবারও সে স্বপ্ন আগুনের লেলিহান শিখায় অঙ্গার হয়ে গেল। হাবিব বলেন, ‘এবার একেবারে পথে বসে গেলাম। দু’বছরের ব্যবধানে সবই হারালাম। গতবারের আগুনে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার পণ্য পুড়েছিল। এবার ৮০ লাখ টাকার পণ্য পুড়ে গেল। কী নিয়ে কোথায় দাঁড়াব তার কূল-কিনারা পাচ্ছি না। অপর ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার রাতে দোকানে তালা লাগিয়ে তিনি বাসায় যান। কিন্তু সকালেই তার সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মো. রিপন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, পাইকারি মসলা বাজারজাত করতেন তিনি। এ দোকানই ছিল তার সব সম্বল। সারাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে বাকিতে পণ্য বিক্রি করতেন তিনি। সেসব হিসাবের খাতা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দোকানে অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।  আরিফ হাসান নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভাই আমরা কেমনে বাঁচব, উপার্জনের একমাত্র সম্বল দোকানটি হারালাম। অনেক কষ্টের জমানো টাকা দিয়েই এ স্বপ্ন সাজাই। কিন্তু আগুন আমার স্বপ্ন ছাই করে দিল।’

ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী সৈয়দা রাবেয়া সুলতানা বলেন, তিনি আর তার স্বামী মনির হোসেন মিলে ঋণ নিয়ে এই মার্কেটে ক্রোকারিজের ব্যবসা করেন। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার স্বপ্নের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

ডিএনসিসি মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এস এম তালাল রিজভি বলেন, মার্কেটে আমদানি করা খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি প্রসাধনীর অনেক দোকান, হার্ডওয়্যারের দোকান, বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান ও প্লাস্টিকের খেলনার দোকান ছিল। আগুন নির্বাপণের পর তার একটিও অক্ষত পাওয়া যায়নি। এই কাঁচাবাজারে ১৮৮টির মতো দোকান ছিল, তার সবই পুড়ে গেছে। তবে কাঁচাবাজার পুড়ে গেলেও পাশের দোতলা মার্কেটটির তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।

অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকলে ব্যবস্থা :মেয়র আতিক

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ। মেয়র বলেন, রাজধানীতে যেসব মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শপিং সেন্টার আছে সেগুলোতে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি-না সেটা খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো মার্কেট কিংবা ভবনে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট মালিক এবং দোকান মালিক সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এ মার্কেটটিতে এর আগে যখন আগুন লাগে তখন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, এখনও নেই। আমরা এখানে ডিএনসিসি স্থায়ী মার্কেট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মামলার জটিলতা আছে। আমরা এই মামলা নিষ্পত্তি করে যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী মার্কেটের দিকে যাব।

মার্কেট নির্মাণে মামলা জটিলতা

২০০৬ সালে মেট্রো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আমিন অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশনের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গুলশান ডিএনসিসি পাকা ও কাঁচা মার্কেটের সাড়ে ৭ বিঘা জমির ওপর দুইটি ১৮ তলা ভবন নির্মাণ করার কথা। এ নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশন দোকান মালিকদের উচ্ছেদ করার নোটিশ দেয়। সম্প্রতি বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল মার্কেট দুইটি পরীক্ষা করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আদালতে সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। অপরদিকে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ঐ জায়গা খালি করার জন্য সিটি করপোরেশনকে চাপ দেয়। এ নিয়ে সিটি করপোরেশন ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করে। মামলাগুলো চলমান থাকায় সেখানে আপাতত কোনো ইমারত নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না।