চট্টগ্রাম মহানগরীতে ছোট-বড় প্রায় শতভাগ ভবন নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে প্রতিমাসে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ৮০ থেকে ১০০টি নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের তালিকা পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে তালিকা পাঠানোর মধ্যেই তাদের দায়িত্ব শেষ। সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্টদের জ্ঞাতসারেই প্রতিটি নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মিত হচ্ছে। যদিও সিডিএ’র অথরাইজ্ড অফিসার মঞ্জুর হাসান জানান, প্রতিমাসে তালিকা পাঠানোর পর তার ফলোআপ করা হয়। কিন্তু গত এক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কয়েকটিকে জরিমানা ও নোটিস প্রদান পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব শেষ। কোনো নকশা বহির্ভূত ভবন ভাঙার বা সরিয়ে ফেলার নজির নেই।
সূত্রে জানা যায়, নগরীর যেকোনো স্থানে ভবন নির্মাণ কাজ সিডিএ’র পরিদর্শকের নজর এড়িয়ে করা সম্ভব নয়। নকশা বহির্ভূত বিভিন্ন ভবন মালিকের মতে, সিডিএ’কে ম্যানেজ করেই তারা ভবন নির্মাণ করেছেন। অথচ সিডিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট জানতে চাইলে তারা লোকবল স্বল্পতার কথা টেনে আনেন।
ইমারত বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী একটি ভবন নির্মাণের পূর্ব থেকে ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদারকি থাকার কথা। কিন্তু সিডিএকে তার ন্যূনতম দায়িত্বও পালন করতে দেখা যায় না। নির্দিষ্ট জায়গায় মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ভবনটি নির্মাণ করা যাবে কি না প্রথমেই তাকে সিডিএ’র প্ল্যানিং বিভাগ থেকে অনাপত্তি ছাড়পত্র নিতে হয়। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বা এলইউসি পেতে একজন ভূমি মালিকের কয়েক মাস সময় লেগে যায়। আবার দেখা যায়, একই প্রশস্তের রাস্তায় একজন ভূমি মালিক ৪ তলা কিংবা ৬ তলা পেলেও পাশের অন্য প্লটের মালিক ৮ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করার অনুমতি পাচ্ছেন। ইমারত বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী পাশে যত বেশি ছাড়বেন উপরের দিকে তত বেশি উচ্চতার অনুমতি পাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, উপরের দিকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে পাশে যে পরিমাণ ছাড়ার কথা তা তারা করছেন না। অসাধু লোকজন উভয় সুবিধাই ভোগ করছেন। অথচ বিধিমালা-২০০৮ এর পূর্বে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির বিপরীতে উচ্চতা নির্দিষ্ট ছিল। এতে অসাধু লোকজন দুটি সুবিধা ভোগ করতে পারত না। বিধিমালা-২০০৮ এর মাধ্যমে জমির মালিকরা যেমন অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করে। একইভাবে সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকে। ইমারত বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী দ্রুত সময়ে ভূমির মালিকগণ নকশা অনুমোদন পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বিধিমালা চালু হওয়ার পর নকশা অনুমোদন পেতে পূর্বের তুলনায় সময় অনেক বেশি লাগছে বলে ভুক্তভোগী ভূমি মালিকগণ জানান। নকশা পেতে যত বেশি সময় লাগে অসাধু লোকজনের জন্য অনৈতিক সুবিধা নিতে সহজ হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র নিতে গিয়েই মোট সময়ের অর্ধেক চলে যায়। সিডিএ’র প্ল্যানিং এবং অথরাইজ্ড বিভাগ নকশা অনুমোদন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু বিধিমালা অনুযায়ী বিল্ডিং নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে যে দায়িত্ব তা পালন করতে দেখা যায় না। ফলে সিডিএ বাস্তবে ইমারত বিধিমালা-২০০৮ এর আংশিক অনুসরণ করে। বরং তাদের বক্তব্য থাকে নকশায় সব কিছু বলা আছে। ভবন মালিকগণ তা না মানলে তাদের করার কিছু নেই। আবার দেখা যায়, একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আর্কিটেক্ট এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের স্বাক্ষর দরকার হয়। সিডিএ’র তালিকাভুক্ত ওই সকল আর্কিটেক্ট ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার স্বাক্ষর করা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে পুরো ভবন নির্মাণ পর্যন্ত তাদের আর দেখা যায় না। এ সকল বিষয়ও সিডিএ’র তদারকিতে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। ফলে ভবন যেমন টেকসই হয় না, একই সঙ্গে অসাধু ভূমি মালিক নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে উত্সাহিত হন। ইমারত বিধিমালা-২০০৮ এর বিভিন্ন নির্দেশনা ও প্রয়োগবিধি আধুনিক এবং সময়োপযোগী না হওয়ায় ইতোমধ্যে এর পরিবর্তন কিংবা বাতিলের দাবি উঠেছে।
স্বয়ং সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস্ ইত্তেফাককে বলেন, ইমারত বিধিমালা-২০০৮ বাতিল করা হউক। তিনি বলেন, এর সঙ্গে বর্তমান বাস্তব অবস্থার অনেক অসঙ্গতি রয়েছে।
