দেশের লবণ শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। রপ্তানিজাত পণ্য উত্পাদনে শিল্পে ব্যবহারের জন্য সোডিয়াম সালফেট আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়েছে সরকার। এ সুযোগে শিল্পের লবণের আড়ালে প্রতারণা করে একটি অসাধু চক্র সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাবার লবণ আমদানি করছে বলে দেশীয় লবণ মিল মালিকরা অভিযোগ করেছেন। আর এসব লবণ দেশের বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে ছাড়া হচ্ছে। শিল্পের নামে আমদানি করা এসব লবণের ক্রয়মূল্য অনেক কম। ফলে দেশে উত্পাদিত লবণ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাজার হারাচ্ছে। এতে ধ্বংসের হুমকির মুখে পড়েছে দেশের লবণ শিল্প।
দেশে তিন শতাধিক লবণ মিল রয়েছে। সাধারণত লবণ মিল মালিকরা লবণ আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পায় না। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নূরুল কবির ইত্তেফাককে বলেন, সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত লবণ দেদারছে আমদানি করা হচ্ছে। কস্টিক সোডা উত্পাদনে ব্যবহারের জন্য ৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে লবণ আমদানির সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ আমরা মিল মালিকরা লবণ আমদানি করলে ১০০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। দেশের ৪টি কস্টিক সোডা ফ্যাক্টরির জন্য ৫/৬ লাখ টন লবণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু চাহিদার অতিরিক্ত লবণ আমদানি করছে তারা। কাস্টমসের শুল্ক কোডের কারসাজিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীরাও দেদারছে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত লবণ আমদানি করছে। চীন ও ভারত থেকে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত আমদানি করা লবণ বাজারে কেজিপ্রতি ১০/১১ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর দেশীয় লবণ কেজিপ্রতি ১৭/১৮ টাকার কম বিক্রি করা যাচ্ছে না। এ অনিয়ম বন্ধ না হলে দেশের লবণ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। চাষিরা লবণ উত্পাদনে নিরুত্সাহিত হবে। বিষয়টি স্বীকার করের বিসিক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি হওয়ার অভিযোগ আমরা পাচ্ছি।
লবণ ব্যবসায়ীরা জানান, সোডিয়াম সালফেট সাধারণত টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ও ওষুধ কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে। এদের চাহিদা বছরে প্রায় এক লাখ টনের মতো। রপ্তানিতজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের কারণে সোডিয়াম সালফেট আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে তারা। অন্যদিকে আমাদের দেশ থেকে বছরে প্রচুর কস্টিক সোডা রপ্তানি হচ্ছে। দেশে ৪টি কোম্পানির কস্টিক সোডা ফ্যাক্টরি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে টেক্সটাইল, গার্মেন্টসের ওয়াশিং কাজে, সাবান ফ্যাক্টরিতে ও পেপার মিলে কস্টিক সোডা ব্যবহার হয়ে থাকে। এ সোডা উত্পাদনে কাঁচামাল হিসেবে লবণ প্রয়োজন হয়। তাই এসব শিল্পের জন্য লবণ আমদানিতে সরকার শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। দেশীয় লবণ গুণগত মান উন্নত না হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে আমদানি করা লবণ তারা কস্টিক সোডা উত্পাদনে ব্যবহার করছে। একজন কস্টিক সোডা ফ্যাক্টরির মালিকের পাশাপাশি লবণের মিল রয়েছে বলে জানা যায়। ফলে কস্টিক সোডা ফ্যাক্টরিগুলো তাদের চাহিদার অতিরিক্ত লবণ আমদানি করে ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারে দেদারছে বিক্রি করছে। এ প্রসঙ্গে মাসুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. আকরামুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, বছরে প্রায় ৪০ হাজার টন কস্টিক সোডা রপ্তানি হয়ে থাকে। আমাদের দেশে প্রতিদিন ৪শ টনের চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশে উত্পাদিত লবণের গুণগত মান উন্নত নয়। লবণের সাথে কাদা থাকায় মেশিনের ক্ষতি হয়। তাই আমদানি করা লবণ কস্টিক সোডা উত্পাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
লবণ চাষিদের অভিযোগ, উত্পাদন খরচও পাচ্ছে না তারা। তাদের প্রতিমণ (৪০ কেজি) ২শ টাকা দরে লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে মণপ্রতি ১শ থেকে ১শ ৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে। চাষিরা জানান, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ লবণ চাষি কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কায়সার ইদ্রিস ইত্তেফাককে বলেন, দেশের লবণ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমদানি করে সোড়িয়াম সালফেট মিশ্রিত লবণ বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রির কারণে দেশীয় লবণের দাম কমে গেছে। বছরে দেশে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টন সোড়িয়াম সালফেটের চাহিদা রয়েছে। অথচ গত বছর তারচে কয়েকগুণ বেশি আমদানি হয়েছে। দেশীয় লবণের সাথে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে সোডিয়াম সালফেট।
