মৃত্যুপথযাত্রী ময়ূর নদ

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২৩:৫৩
নিঃশেষ হওয়ার পথে খুলনা মহানগরীর গর্ব ময়ূর নদী। অব্যাহত দখল, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা ও মাত্রাতিরিক্ত দূষণে একসময়ের প্রমত্ত এ নদীর পানি আজ সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মান-মাত্রার চেয়ে কম থাকায় এ পানি কৃষি-ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। খুলনা মহানগরী ঘেঁষা এ নদীটি অচিরে হারিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
 
খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ময়ূর নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ কিলোমিটার। এই নদী  একসময়ে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি ও মাছের অন্যতম আধার ছিল। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার হতো এ নদীর পানি; কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে এ নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে অপ্রতিরোধ্য দখলে দিন দিন ময়ূর নদী তার আয়তনও হারাচ্ছে। এই নদীর পানি নিয়ে খুলনার পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ সালে পরীক্ষা শুরু করে। ওই পরীক্ষায় নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসছে বলে তথ্য মিলেছে, যা জলজ প্রাণির বেঁচে থাকা ও কৃষিকাজে ব্যবহার করার অনুপযোগী। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, মাছসহ জলজপ্রাণী বেঁচে থাকা ও নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন সর্বনিম্ন  প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম থাকার কথা; কিন্তু ২০১১ সালের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাকালে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে চার মিলিগ্রাম, যা কমে বর্তমানে গড়ে প্রতি লিটারে দুই মিলিগ্রামে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের ১৮ আগস্ট পরিবেশ অধিদপ্তর, নদীটিকে রক্ষায় সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, এনজিও ও পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনাকে যৌথভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও এখনো পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। 
 
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সিনিয়র কেমিস্ট মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, দিন দিন ময়ূর নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নদীর পানিতে প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ১.১, ফেব্রুয়ারিতে যা দাঁড়িয়েছে ১.৩ মিলিগ্রাম। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বায়োলজিক্যালি অর্থাত্ বৈজ্ঞানিকভাবে এই নদী মৃত হয়ে যেতে পারে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্চ মাসে ওই নদীর প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের দ্রবীভূত মাত্রা ছিলো ০.৫ মিলিগ্রাম, মে মাসে ০.৮, জুনে ০.৮, জুলাইয়ে ২.১, আগস্টে ২.৫, সেপ্টেম্বরে ২.৮ ও অক্টোবরে ২.৯ মিলিগ্রাম। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষণা অনুয়ায়ী, আরএস খতিয়ানে ময়ূর নদীর যে এলাকা ছিল সেখান থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নদী দখল হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নদীর আরো ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমি দখলদারদের কবলে চলে গেছে। আর ২০১০ থেকে ২০১৪— এই চার বছরে নদী তার সর্বশেষ আয়তনের ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ হারিয়েছে।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তুষার কান্তি রায় তার গবেষণার তথ্য দিয়ে বলেন, ময়ূর নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বর্তমানে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত। রূপসা নদীর সংযোগস্থলে স্লুইস গেট নির্মাণ ও তা  রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ময়ূর একটি বদ্ধ জলাধারে পরিণত হয়েছে, এ দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।
 
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২৬টি ড্রেন থেকে বর্জ্যমিশ্রিত পানি পড়ছে ময়ূর নদীতে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,  পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত পানি প্রবাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঐতিহ্যবাহী এই নদীটি ঢাকার বুড়িগঙ্গা, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ও ঢাকার তুরাগের মতো দূষণের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
 
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের চিফ প্লানিং অফিসার আবীর-উল-জব্বার বলেন, ‘ময়ূর নদী বাঁচাতে আমরা যে পরিকল্পনা নিয়েছি তা স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ময়ুর নদীকে ঘিরে এখনও পর্যন্ত যে কটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা মামলার কারণে আটকে রয়েছে। এছাড়া নগরীর সুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে ময়ূর নদীতে পড়ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ওয়াসা কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে ময়ুর নদী দূষণ রোধ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ২০১৭ সাল থেকে ৮’শ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। দাতা সংস্থার অর্থায়ন পেলে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলি বাস্তবায়ন হলে ঐতিহ্যবাহী এ নদীটিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
 
ইত্তেফাক/নূহু