বেনাপোল আর পেট্রাপোলোর মাঝে অবস্থিত সীমান্তের ‘শূন্য আঙিনা’ গতকাল মঙ্গলবার একুশের সকাল থেকেই মুখরিত ছিল দুই বাংলার মানুষের পদচারণায়। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অমর হোক বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চালু হোক’ এই স্লোগান নিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে বাংলাদেশের বাঙালিদের সঙ্গে সমবেত হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কড়া। তার মধ্যেই আড্ডা আর স্মৃতিচারণে মেতে ওঠেন সবাই। হিলি ও ছাগলনাইয়া-শ্রীনগর সীমান্ত হাট এলাকাতেও একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আমাদের বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা জানান, সীমান্তের ‘শূন্য আঙিনা মুখর ছিল নাচ, গান, আবৃত্তি আর দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের পদচারণায়। এক সময় বাংলাদেশ ও ভারত অংশে আলাদাভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এবার যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেনাপোল ও বনগাঁও পৌরসভা।
সকালে সেখানে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, তথ্য ও প্রযুক্তি দফতরের মন্ত্রী শ্রীমতি ব্রাত্য বসু, বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্রাচার্য্য, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার, বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন ও যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান।
‘শূন্য আঙিনা’য় নির্মিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশে মঞ্চে’ ছিল মূল আয়োজন। অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী খুরশিদ আলম, রথিন্দ্রনাথ রায় ওপার থেকে আসা শিল্পী অরুন্ধতী হোম চৌধুরী, অর্পিতা চক্রবর্তী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে আরো হাজির ছিলেন খ্যতনামা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কবি আসাদ চৌধুরী, নাট্যকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এ উপলক্ষে নোম্যান্স ল্যান্ডকে সাজানো হয় দুই দেশের পতাকা, নানা রঙয়ের ফেস্টুন, ব্যানার ও ফুল দিয়ে। ভাষা দিবসের এই অনুষ্ঠানে বিজিবি বিএসএফকে শুভেচ্ছা জানায় ফুল দিয়ে।
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের শূন্য আঙিনায় সৌহাদ্য ও সম্প্রীতির প্রয়াসে অমর একুশে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার এপার বাংলা-ওপার বাংলার বাংলাভাষী মানুষের মিলন মেলা বসেছিল।
হাকিমপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড এবং সাপ্তাহিক আলোকিত সীমান্ত’র যৌথ উদ্যোগে সকাল ১১টায় হিলি সীমান্তের শূন্য রেখায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এমপি। ফুল দিয়ে ভারতের আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের বরণ করে নেয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১ টায় শূন্য রেখার পাশে নির্মিত শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। ভারত থেকে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ কবিতা আবৃত্তি এবং বক্তব্য রাখেন। এরপর হাকিমপুর শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
ছাগলনাইয়া (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মোকামিয়া গ্রামে ছাগলনাইয়া-শ্রীনগর সীমান্ত হাটে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গতকাল মঙ্গলবার শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০১৭ পালন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান ও ত্রিপুরা বিধান সভার সদস্যা রিতা কর মজুমদার। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, ভারতের সংসদ সদস্য জিতেন্দ্র চৌধুরী, জাসদের (একাংশ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি, ত্রিপুরা বিধান সভার সদস্য প্রভাত চৌধুরী, ত্রিপুরার জেলা শাসক সি কে জামাতিয়া।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে আরো উপস্থিত ছিলেন, ৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন ফেনীর অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল ইসলাম, ফেনীর পুলিশ সুপার মো. রেজাউল হক পিপিএম, ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বি.কম, পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার, ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার, সহকারী কমিশনার ভূমি নাসরিন সুলতানা।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলে আরো উপস্থিত ছিলেন, দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার এসপি তপন দেব বর্মা, পুয়াংবাড়ী পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান বাবুল সেন, স্বশাসিত জেলা পরিষদের সদস্য অরুণ ত্রিপুরা। আলোচনা সভার পূর্বে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ। শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভারতের শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
ইত্তেফাক/নূহু
