চার শ বছরের প্রাচীন নগর ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ১৮ শতকের গোড়ার দিকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক আবাসিক প্রতিনিধি জন টেইলর বুড়িগঙ্গার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, বর্ষাকালে যখন নদীটি পানিতে পরিপূর্ণ থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো। কালের আবর্তে বুড়িগঙ্গার সেই সৌন্দর্য এখন শুধুই ইতিহাস। এক সময় যে নদীকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল ঢাকার নগরায়ন এখন সেই নগরায়নই যেন ক্রমশ নিঃশেষ করছে বুড়িগঙ্গাকে।
বর্তমানে বুড়িগঙ্গা ভয়াবহ দূষণের শিকার। বিগত ৩০-৪০ বছরের নগর জীবনের বিরূপ প্রভাবে দূষিত এ বুড়িগঙ্গা। নদী দখল, কাঁচামালের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, ইটভাটা ও পলিথিন ইত্যাদির কারণে বুড়িগঙ্গা দূষিত বর্জ্যের আধারে পরিণত হয়েছে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পবর্জ্য। নদীতে পড়া বর্জ্যের ৬০ শতাংশ শিল্প খাতের। ৪০ শতাংশ ট্যানারি শিল্পের। ২০ শতাংশ অন্য শিল্পের। এর বাইরে ১৫ শতাংশ কঠিন বর্জ্য, ১৫ শতাংশ অন্য ও ১০ শতাংশ নৌযান বর্জ্য। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন ঢাকা শহরের চার হাজার ৫০০ টন আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এবং ২২ হাজার লিটার বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য এ নদীকে হজম করতে হচ্ছে। এছাড়া পলিথিন জমে নদীটির তলদেশে ১০-১২ ফুট ভরাট হয়ে গেছে।
সরেজমিন বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া এলাকা থেকে পোস্তগোলা এলাকা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পানি কুচকুচে কালো রঙের। নাকে-মুখে রুমাল চেপে স্থানীয়দের নৌকা পারাপার হতে দেখা গেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ফল ব্যবসায়ীরা সদরঘাটে ফল এনে এর বর্জ্য ফেলছে বুড়িগঙ্গায়। তবে সিটি কর্পোরেশনের কাছে একটি ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানানো হলেও তা না হওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা বিভিন্ন বর্জ্য নদীতে ফেলছে।
ঢাকা ওয়াইজঘাট আড়তদার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, ‘বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা এবং ফরিদপুরের একাংশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে ফল আসে। কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় অনেকে নদীতে এসব ফলের বর্জ্য ফেলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই নদী দূষণ না হোক। কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না।’
বিআইডব্লিউটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মিশা বলেন, ২২৭টি সংযোগ খাল ছিল এ বুড়িগঙ্গায়। এর মধ্যে দখলকৃত ১৭০টি খাল উদ্ধার করা গেছে। বাকিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারণ প্রভাবশালীরা এসব খাল দখলের সঙ্গে জড়িত আছে। মসজিদ নির্মাণের নামেও দখল করা হয়েছে এসব খাল। তবে নদীর পরিবেশ রক্ষা করার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এরই মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী দূষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। শুধু দখল রোধে কিছু অভিযান চালানো হয়েছে মাত্র।
কেরাণীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার মোহাম্মদ ফকুরজ্জামান জানান, বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁচাতে সরকারের যত পদক্ষেপ রয়েছে তার সবটুকু গ্রহণ করা হবে। তবে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচানো যাবে না।
ইত্তেফাক/সালেহ্
