মানিকগঞ্জের ঘিওরে বেদখল হয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকার সম্পত্তি। পাউবোর মালিকানাধীন জায়গা দখল করে ঘর নির্মান করেছে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি। এছাড়াও পাউবোর জমি ভূয়া দলিল তৈরি করে কেনা বেচার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিদিন লাখ টাকার মাটি বিক্রি করতে বসানো হয়েছে কমপক্ষে ৪/৫ টি ড্রেজার ও ভেকু। যেন ক্ষমতা যার পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা তার।
জানা যায়, উপজেলার বানিয়াজুরি ইউনিয়নের নয়াচর, তাড়াইল, কাকজোড় গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন একটি সরকারি বেড়িবাঁধ রয়েছে। এসব এলাকায় কতিপয় চিহিৃত ভূমিদস্যুর দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলাকাবাসী।
এ নিয়ে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন সুফল পাচ্ছেনা ভূক্তভোগীরা। উল্টো ভুমি দস্যুদের দাপটে মামলা হামলার শিকার হচ্ছেন অনেকেই। আবার লিজের নাম করে পাউবো ও পাশ্ববর্তী কৃষকদের মালিকানাধীন জায়গা থেকে জোরপুর্বক ভেকু ও ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রি করে আসছে।
সরজমিনে জানা যায়, উপজেলার বানিয়াজুরি ইউনিয়নের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে নয়াচর তাড়াইল হয়ে সরুপাই পর্যন্ত প্রায় ৭১.২৬ একর ভূমি (৬৪/৭০-৭১ইং সালে এল.এ. কেস নং) বেড়িবাঁধের প্রয়োজনে পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে বাঁধের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমিগুলো পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই সুযোগে এলাকার কিছু ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও ভুমি দস্যুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তির তথ্য গোপন করে সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের একশ্রেনীর অসাধু কর্মকর্তা ও দলিল লেখকদের আঁতাত করে জাল দলিল বানিয়ে তা কেনাবেঁচা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এলাকাবাসী জানান, কাকজোড় এলাকার চিহিৃত ভূমিদস্যু ও মামলাবাজ হিসেবে পরিচিত আবদুল আউয়াল আনছারী, কাকজোড় গ্রামের ইন্তাজ সিকদারের ছেলে আলম সিকদারের কাছ থেকে নয়াচর-তাড়াইলের মৌজার জে.এল. নং-১৫১, আর,এস ২৮৮ খতিয়ান ভুক্ত ১৪৭১/১৭৭০ নং দাগের সাড়ে ৮ ডিসেমল জায়গা গত ০২/০৪/২০০৬ ইং দলিল করে নেয়।
অভিযোগ রয়েছে শুধু এই জায়গাই নয় সরকারি ও ব্যক্তিগত ঝামেলাযুক্ত জায়গা সে নামমাত্র দরে কিনে প্রভাব খাটিয়ে দখল করে নেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন জায়গা কিভাবে কোন ব্যক্তির কাছ থেকে সে ক্রয় করে স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে আউয়াল আনছারী বলে, কাগজপত্র দেখে কিনেছি। আমার নামে নিউজ করে কোনো লাভ নাই। আমার ওপরে অনেক লোকের খুঁটির জোর আছে। ঝামেলা করলে আপনাদের দেখে নেয়া হবে।
তৎকালীন (২০০৬ সালে) দলিলটি সম্পাদন করেন ঘিওর সাব-রেজিষ্টার রুহুল ইসলাম। বর্তমানে তার কর্মস্থল পরিবর্তন হওয়ায়, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে পাউবোর মালিকানাধীন জায়গা থেকে প্রতিদিন লক্ষ টাকার মাটি কিনে বিক্রি করছে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতারা। মাটি কাটার ফলে পাশ্ববর্তী কৃষকদের জমি-জমা ভেঙ্গে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ভুক্তভূগী কৃষকেরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে ড্রেজার মালিক মোহাম্মদ আলী, জয়নাল আবেদীন টুকন জানান, আমরা জমির মালিকদের কাছ থেকে মাটি কিনে নিয়েই বিক্রি করছি। এতে দোষের কিছু নেই। এছাড়াও উপজেলা প্রশাসনকে প্রতিমাসে মাসোহারা দেওয়া হয়।
বানিয়াজুরী ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চতু বলেন, জায়গাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন। তাই তারা যদি তাদের সম্পত্তি রক্ষা না করে তাহলে আমাদের কি করার আছে। পাউবো কর্মকর্তা এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সরকারী সম্পত্তি রক্ষায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন। দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনে আমরাও সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার জানান, দ্রুতই ভূমিদস্যু ও অবৈধ মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, বিষয়টি জানার পর আমরা অবৈধ দখলদারদের অনুপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ভূয়া দলিলে পাউবোর জায়গা বিক্রির বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তবে দ্রুতই আমাদের কর্মকর্তারা গিয়ে ব্যবস্থা নেবেন এবং পাউবোর আওতাধীন জায়গা দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
