রাজধানীর যানজট নিরসনকল্পে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় কয়েকটি যান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হলেও তার কোনোটিই কাজে আসেনি। শেষমেশ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশ বিভাগকে হাতের সংকেতের মাধ্যমেই পালন করতে হয়েছে। ঢাকার সিগন্যাল বাতি রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা ছিল। মুখ থুবড়ে পড়ে এই পরিকল্পনা। এরপর নেওয়া হয় প্যানেল বোর্ড পদ্ধতি, যা এখনো পরীক্ষামূলক অবস্থায় রয়েছে।
গত ১৬ বছরে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি নিয়ে তিন দফায় প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা সিটি করপোরেশন। এতে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হলেও রাজধানীবাসী কোনো সুফল পায়নি।
মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সত্তরের দশকের শেষের দিকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের মোড়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে মোটরযান থামা-চলার নির্দেশনা সংবলিত নানা রঙের ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়েছিল। উন্নত দেশের মহাসড়কে এ পদ্ধতি ব্যবহূত হতে দেখে তা দেশেও ব্যবহার করা হয়। পথচারীসহ চালক সবাই এ ব্যবস্থা মেনে নেয়। প্রথমদিকে সিগন্যাল বাতির ব্যবহার ঠিকমতো হতো। সময়ের সঙ্গে বাড়ে গাড়ির সংখ্যা। কার্যকারিতা হারাতে বসে যানজট নিয়ন্ত্রণে সিগন্যাল বাতি ব্যবস্থা। বাতিগুলো যথাসময়ে জ্বলে-নেভে ঠিকই; কিন্তু যান চলাচল করে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। সিগন্যালে পড়ে ভোগান্তি বাড়ে যাত্রীদের। এ প্রেক্ষাপটে শুরু হয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ে নতুন গবেষণা।
পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০১-০২ অর্থবছরে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় ট্রাফিক বিভাগের উত্তরে (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) ৩০টি এবং দক্ষিণ বিভাগে ( দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) ৪০টি অটো সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০০৮ সালের শেষ দিকে। এরপর ২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে চালুর সময় বেশ কয়েকটি অটোসিগন্যাল বাতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। যেগুলো সক্রিয় ছিল তা দিয়েই মহানগর ট্রাফিক পুলিশ সবুজ, হলুদ ও লাল বাতির মাধ্যমে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। চালকদের মধ্যেও এ সিগন্যাল পদ্ধতি মেনে চলার অভ্যাস গড়ে উঠছিল। এক পর্যায়ে অটোসিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডিসিসি ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় ট্রাফিক পুলিশ ওই সিগন্যাল বাতি অনুসরণ না করে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। পাশাপাশি অটোসিগন্যাল রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার না হওয়ায় অল্প দিনেই অধিকাংশ সিগন্যাল বাতি অকেজো হয়ে পড়ে। রাজধানীর যানজট নিরসন পুরনো অবস্থায় ফিরে আসে।
এ অবস্থায় ২০১০-১১ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয় ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্প। এর আওতায় উত্তর সিটিতে ৩০টি পয়েন্টের মধ্যে ২৮টিতে এবং দক্ষিণের ৪০টি পয়েন্টের মধ্যে ৩৬টিতে সোলার প্যানেল, টাইমার কাউন্ট-ডাউন, ইনভার্টার, কনভার্টার, কন্ট্রোলার ও ক্যাবল স্থাপনের কাজ শেষ হয়। যদিও ঢাকা উত্তরের ২৮টি এবং দক্ষিণের ২৫টি পয়েন্টে সোলার নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক সিগন্যাল চালু রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৫ মে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর কাকলী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ১১টি পয়েন্টে অটোসিগন্যাল চালু করা হয়েছিল। কিন্তু চালুর পরেই তীব্র যানজটে পুরো ঢাকা স্থবির হয়ে পড়ে। তিন-চার দিনের মাথায় ব্যয়বহুল এই ব্যবস্থার পরিবর্তে পুলিশ সেই হাত ও বাঁশির ব্যবস্থায় ফিরে যায়।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের অধীনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সোলার প্যানেল, টাইমার কাউন্ট-ডাউন স্থাপন এবং বিভিন্ন সিগন্যালে যেসব বাতি নষ্ট ছিল সেগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। পরিকল্পনা ছিল এসব সিগন্যালবাতি ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইয়ের আদলে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ জন্য ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষামূলকভাবে একটি রিমোট কন্ট্রোল আনা হয়েছিল। কিন্তু তা আমাদের সিস্টেমের সঙ্গে মেলেনি। তাছাড়া ভারতীয় ওই প্রতিষ্ঠান শেষটায় জানিয়ে দিয়েছে এদেশের সিস্টেমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রিমোট তৈরি করা সম্ভব না। ফলে বাতিল হয় পদ্ধতিটি।
তিনি বলেন, সর্বশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয় প্যানেল বোর্ড সিস্টেম। সড়কে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী বোর্ডে লাগানো পেন্ডুলাম ঘুরিয়ে ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নির্ধারণ। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে গত সপ্তাহে রাজধানীর দৈনিক বাংলার মোড়ে পরীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সিগন্যাল বাতির বোর্ড নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
নগরীর যানজট কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে এমন প্রশ্নের জবাবে মোসলেহ উদ্দিন বলেন, প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরী ঢাকা। যেখানে রাস্তা থাকার কথা ২৫ ভাগ। সেখানে আছে মাত্র ৮ ভাগ। তিনি বলেন, রাজধানীর সড়ক তিন লাখ যান চলাচলের উপযোগী। কিন্তু বর্তমানে রাজধানীতে চলে ১১ লাখ যানবাহন।
এ ব্যাপারে সড়ক বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেন, ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে অনেক পাগলামি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে, কিন্তু সেটা ব্যবহার করার মানসিকতা নেই। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এসব ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশ ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার দায়িত্ব নিলে ভালো। তবে তার আগে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুলিশের ট্রাফিক প্রকৌশল বিভাগ করে দিতে হবে। বিশেষায়িত এই বিভাগ সারা বছর সিগন্যালের বিষয় দেখাশোনা করবে।
ইত্তেফাক/নূহু
