গানের টানে মিলেছে প্রাণ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৭, ০০:৫৫

মানুষের প্রাণে সংস্কৃতির সুর ছড়াতে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতেন ওয়াহিদুল হক। তিনি বলতেন, ‘তোমরা যে গান গাও কবিতা পড় সেসব কথা কী তোমরা নিজেরা অনুভব কর? যদি নিজেরা তা উপলব্ধি না কর তাহলে যাদের উদ্দেশে তোমাদের এত আয়োজন তাদেরও বোঝাতে পারবে না। সংস্কৃতির পথ শুধু মানুষকে টেনে আনা নয় নিজেদেরও উত্তরণ ঘটানো’। সেই টানেই সারাদেশের শত সহস্র শিল্পী এসে মিলিত হয়েছেন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী চত্বরের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে।

কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয় তারপরও সারাদেশ থেকে এত মানুষ অংশ নিতে এসেছে যা রীতিমত বিস্ময়কর। অনেকে ব্যাগসমেত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, রাতে কোনো আত্মীয়ের ঠিকানা খুঁজে নেবেন। শুধু বড়রা নয় গানের টানে, গাইবার টানে, প্রতিযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসেছে প্রায় পাঁচশ শিশু-কিশোর। শাহবাগের কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী চত্বর মুখরিত হয়ে উঠেছে সারাদেশ থেকে গানের টানে ছুটে আসা শত সহস্র মানুষের পদচারণায়। মঞ্চে চলছে প্রতিযোগিতা। আর বাইরে চত্বরে চলছে আড্ডা আর আগামি তিনদিনের প্রস্তুতি।

‘মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উত্সাহ’ এ শ্লোগানে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের আয়োজনে ৩৬তম জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়েছে ঢাকায়। গানে গানে সারাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে  তোলার প্রত্যয়ে নিয়মিতভাবে আয়োজন হয় এই সম্মেলনের। সংস্কৃতির শুভতা দিয়ে ধর্মান্ধতা ও মানবিক অবক্ষয়       রোধ করার প্রত্যয়ের কথা বললেন সারাদেশের নাম না জানা অগণিত শিল্পী।

পাবলিক লাইব্রেরী মঞ্চে দিনাজপুরের নবম শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়াংকা ঘোষ গান ধরেছেন, ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি/শুষ্ক হূদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে/ ঊর্ধ্বমুখে নরনারী।’ প্রিয়াংকা মায়ের সঙ্গে ঢাকা এসেছেন গতকাল। ঠাকুরগাঁও থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী রাইসা তাসনিমও এসেছেন মায়ের সঙ্গে। গানের টানে। তাসনিম গাইলেন, ‘কেন তোমরা আমায় ডাকো, আমার মন না মানে। পাই নে সময় গানে গানে।’ প্রিয়াংকা তাসনিম জানায়, গানের টানে এসেছেন তারা। শুধু গান নিয়ে সারাদিন কাটানোর সুযোগ তো সবসময় মেলে না।

তবে আয়োজনের সারমর্ম সুন্দর করে গুছিয়ে বললেন, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া থেকে অধিবেশনে যোগ দেয়া সুজিত কুমার মণ্ডল। বললেন, দেশের সব জেলার মানুষ আসে। তাদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয় সেই টানেই ছুটে আসি। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে সঙ্গীত জগতে, তাদের গান শুনি। ভালো লাগে।

জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ইদানীংকালের অবাঞ্ছিত হত্যাকাণ্ডমূলক মৃত্যু-আঘাতগুলো প্রতিহত করবার শক্তি অর্জনের জন্য, তাদের প্রতিহত করবার জন্য এ সম্মেলন থেকে গানে গানে আহ্বান জানানো হবে। আপন সত্তার কাছেই আমাদের প্রার্থনা, আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমরা সব প্রতিকূলতা প্রতিরোধ করব। তিনি জানান, ৪৮টি জেলা থেকে শিল্পী, প্রতিনিধি ও প্রতিযোগীরা অংশ নিয়েছে এ সম্মেলনে।

ছায়ানটের সহ-সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বললেন, পাকিস্তান আমল থেকেই সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বাধা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরেও সেই বাধা নতুন করে শুরু হয়েছিল। সে সময় সারাদেশব্যাপী বাঙালি সংস্কৃতির প্রসারের প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধিতে আসে। এর পথ ধরেই জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের জন্ম ১৯৮০ সালে। প্রথমে নাম ছিল জাহিদুর রহিম স্মৃতি সংসদ। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ বেতার থেকে হঠাত্ করেই স্বনামধন্য এই শিল্পীর চাকরি চলে যায়। এর কদিন পরেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান শিল্পী জাহিদুর রহিম। পরে সংগঠনের নাম বদল করে কাজের ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়। যদিও এখনো প্রতিবছর সঙ্গীত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুণী শিল্পীকে ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য বাঙালির আপন সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসার ঘটানো।

সম্মিলন পরিষদের সহ-সভাপতি শিল্পী বুলবুল ইসলাম বললেন, স্বাধীনতার পরে এই সম্মিলন পরিষদ স্বাধীনতা-উত্তর মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। যে যুদ্ধ আজো শেষ হয়নি। অশুভের বিরুদ্ধে শুভতার এ যুদ্ধ চলমান।

পরিষদের কোষাধ্যক্ষ শিল্পী লিলি ইসলামের কণ্ঠেও সেই সুর। বলেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে সমাজে যে অবক্ষয়, শিক্ষায় যে অবক্ষয় শুরু হয়েছে তা রোধ করা যাবে না। মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরণই এ সংকট কাটাতে পারে। আর সে জন্য সারাদেশ জুড়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

তিন দিনের যত আয়োজন

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে প্রাক-সম্মেলন পর্ব। সারাদেশ থেকে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচশ প্রতিযোগী ঢাকার মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এখন ঢাকায়। গতকাল সারা দিন ধরে চলেছে গানের প্রতিযোগিতা। আবৃত্তিও রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে সেমিনার ও গুণীজন সম্মাননা পর্ব। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় এ উত্সবের উদ্বোধন করবেন শিল্পী রফিকুন নবী। আর সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এদিনে তবলাশিল্পী মদন গোপাল দাস ও পটশিল্পী শম্ভু আচার্যকে গুণীজন সম্মাননা জ্ঞাপন ও রবীন্দ্রপদক প্রদান করা হবে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন বিকালে ‘সভ্যতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ’ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন ভূঁইয়া ইকবাল। আলোচনা করবেন ডা. সারওয়ার আলী ও মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন। এর পাশাপাশি প্রকাশিত হবে বিশিষ্টজনদের লেখা নিয়ে প্রবন্ধ সংকলন ‘সঙ্গীত সংস্কৃতি’।

ইত্তেফাক/নূহু