তালায় সেই ৭ মানসিক রোগীর চিকিৎসা চলছে ঝাঁড়ফুকে!

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৭, ০৯:৫০
 
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার প্রসাদপুর গ্রামের রহমত আলী বিশ্বাসের গোটা পরিবারসহ এলাকার লোকেরা কুসংস্কারে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কথিত জ্বীন ধরে রোগীদের চিকিত্সা হচ্ছে তাবিজ-কবজ এবং ঝাঁড়ফুকের মাধ্যমে। যে কারণে রহমত আলী বিশ্বাসের পরিবারের সদস্য কথিত জ্বীনে ধরা সাত মানসিক রোগীর মধ্যে চারজন রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।
 
বৃহস্পতিবার রহমত আলী বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে আগের মতো এখনও উৎসুক লোকজন কথিত জ্বীন রোগে আক্রান্তদের দেখার জন্য ভিড় করছে। রহমত বিশ্বাসের পরিবারের মানসিকভাবে অসুস্থ সাতজন রোগীর মধ্যে গফুর বিশ্বাস (১৬), হালিম বিশ্বাস (২৮) এবং ফরিদা বেগম (৩৫) ও তাঁর মেয়ে আয়েশাকে (৫) ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। আর তাদের অপর ভাই সবুর বিশ্বাসের (২৫) পায়ে শিকল পরিয়ে জানালার গ্রিলের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তবে শিশু আয়েশা এখন আগের চেয়ে সুস্থ হলেও তাকে তাঁর মায়ের কাছে রাখা হয়েছে। এছাড়া সালেহা খাতুন এবং মেহেদী হাসান আগের চেয়ে একটু সুস্থ হওয়ায় তারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর গ্রামের লোক এসে বন্দী রোগীদের জোর করে ভাত, কলা ও সাগু খাওয়াচ্ছে।
 
প্রতিবেশী মোসলেম বিশ্বাস জানান, ‘বাড়ির পাশে এতগুলো লোক পাগল হয়ে গেছে। বিবেকের তাড়নায় আমরা মাঠের কাজ-কাম ছেড়ে দিয়ে সারাদিন পাগলদের দেখাশুনা করছি।’
 
এদিকে, মানসিক রোগে আক্রান্ত ঐ সব ব্যক্তিদের এখনও কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছ থেকে আধুনিক চিকিত্সা নিতে দেয়নি তাদের পরিবারের সদস্যরাসহ এলাকার লোকজন। গত শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক সপ্তাহ বিভিন্ন ওঁঝা-কবিরাজের মাধ্যমে ঝাঁড়ফুক দিয়ে চলছে তাদের চিকিত্সা। রোগীদের পরিবার এবং প্রতিবেশীদের বিশ্বাস- কুফরী কালাম এবং জ্বীনের প্রভাবে রহমত আলীর ৩ ছেলে, ২ মেয়ে এবং ২ জন নাতী ও নাতনী পাগল হয়ে গেছে। তাদের চিকিত্সার জন্য ডাক্তার দেখালে তারা আরো বেশি পাগল হয়ে মারা যেতে পারে। যে কারণে বিভিন্ন এলাকার ওঁঝা-কবিরাজ দিয়ে ঝাঁড়ফুকের চিকিত্সা করানো হচ্ছে।
 
এ বিষয়ে রহমত বিশ্বাস, তার স্ত্রী নবীজান বেগম এবং ছেলে হায়দার বিশ্বাস আগের মতো জানান, মূলত তাদের বোন ফরিদাকে শশুর বাড়ির লোকজন কুফরি জাদু করে জ্বীনের মাধ্যমে পাগল করে দিয়েছে। আর এখন এই বাড়ির প্রায় সকলে একে একে পাগল হয়ে যাচ্ছে। রহমতের প্রতিবেশী সুফিয়ান শেখ, রহিমা বেগম, হাফেজ মো. ইউছুফ ও খাইরুল বিশ্বাস সহ একাধিক ব্যক্তি জানান, রহমত আলী বিশ্বাসের ছেলে, মেয়ে এবং নাতি-নাতনীরা কুফরি জাদু ও জ্বীনের কারণে পাগল হয়ে গেছে। আর বাড়ির অন্য সদস্যরা যাতে পাগল না হয় সেজন্য সকলের জন্য তাবিজ করা হয়েছে। এছাড়া ফরিদার স্বামী-শশুরদের করা কুফরি জাদু নষ্ট করার জন্য তিনদিন আগে এলাকা থেকে কাছেদ বিশ্বাস, আতিয়ার বিশ্বাস এবং রাবেয়া বেগম ঝিনেদার বুয়াভাটরা গ্রামে গেছে বলেও তারা জানান।
 
স্থানীয় যুবলীগ নেতা মাসুদ বিশ্বাস জানান, রহমত আলীর জ্বীনে ধরা ছেলে ও মেয়েদের চিকিত্সার জন্য সোমবার সন্ধ্যায় একটি পিকআপে করে বেঁধে যশোরের নওয়াপাড়া পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তদ্বীর করে কোনও উপকার না হওয়ায় মঙ্গলবার পাগলদের মিকশিমিল আমুরডাগা গ্রামে এবং পরে ডুমুরিয়ার নির্মল হাড়ি নামের দুই ওঁঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও কোনও উপকার না হওয়া বৃহস্পতিবার কেশবপুর এলাকা থেকে আরো দুইজন ওঁঝাকে বাড়ি আনা হচ্ছে।
 
অসুস্থদের পিতা রহমত আলী ও মাতা নবীজান জানালেন, এসব ওঁঝা কবিরাজ দিয়ে এবার তারা ভাল না হলে কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। এদিকে অসুস্থদের দেখতে আসা যুবলীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম খাঁ ও জাহিদ বিশ্বাসসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কবিরাজের কাছে ভারণ দিয়েছি। সকল কবিরাজরা বলেছে, ফরিদা যে স্বর্ণের মূর্তি পেয়েছিল তা বিক্রি করার অর্ধেক টাকা মসজিদ এবং মন্দিরে দান করলেই সকলে ভাল হয়ে যাবে।’ তবে, অন্য কয়েকজন বললেন ভিন্ন কথা। এই উত্সুকদের বক্তব্য, ফরিদা স্বর্ণের যে মূর্তি পেয়েছিল তা বিক্রি করার জন্য এক ব্যক্তির কাছে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যক্তি স্বর্ণের মূর্তিটি বিক্রি করে সব টাকা আত্মসাত্ করেছে। এই শোকে ফরিদাসহ বাড়ির সকলে পাগল হয়ে যাচ্ছে।
 

তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফরিদ হেসেন বলেন, সোমবার দুপুরে খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কুদরত-ই-খুদা এবং থানার ওসি মো. হাসান হাফিজুর রহমানকে সাথে নিয়ে রহমত আলীর বাড়িতে যায়। আমরা দুই ঘন্টা চেষ্টা করেও মানসিকভাবে অসুস্থদের চিকিত্সা দিতে পারিনি। ঘটনাটি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এবং সিভিল সার্জনকে অবহিত করা হয়েছে।