দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে দরিদ্রের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জামালপুর জেলাবাসী। তার মূল কারণ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী। জামালপুরের দুঃখ যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর ভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কলকারখানা না থাকায় কর্মসংস্থানের অভাব, চরাঞ্চলে শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। প্রতিবছর যমুনার অব্যাহত ভাঙনে হাজারো পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়ে। নব্বই দশকের পর থেকে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার, শত শত বসতভিটা, গাছপালা, হাজার হাজার একর ফসলি জমি যমুনার করাল গ্রাসে বিলীন।
গত ১৫ বছরে ইসলামপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থে প্রায় আট কিলোমিটার অর্থাত্ প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং পাঁচ কিলোমিটার প্রস্থ অর্থাত্ প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং চার কিলোমিটার প্রস্থ অর্থাত্ প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার, মাদারগঞ্জ উপজেলার পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং তিন কিলোমিটার প্রস্থ অর্থাত্ প্রায় ১৫ বর্গ কিলোমিটার সবমিলিয়ে প্রায় ২৬৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জেলার মূল ভূ-খণ্ড থেকে যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। নিঃস্ব হয়েছে হাজার হাজার পরিবার। এসব পরিবারের অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাই ভাঙনকবলিত জামালপুরবাসীর দুঃখ এখন ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যমুনার ভাঙন রোধে প্রথমে ৪১৭ কোটি টাকা, পরে পর্যায়ক্রমে ৪৮৯ কোটি টাকার বালির বস্তা ডাম্পিং এবং কংক্রিট ব্লক বসানোর কাজ প্রায় শেষ হতে চলেছে। এ কাজ শুরুর পর থেকে যমুনার ভাঙন অনেকটাই রোধ হয়েছে। এছাড়া দরিদ্রতার কবল থেকে জেলাবাসীকে রক্ষার জন্য নদীভাঙন রোধসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। আরো কাজ চলমান রয়েছে।
অপরদিকে উত্তরবঙ্গের ১৩টি জেলার সাথে জামালপুর হয়ে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের জন্য ১৯৩৮ সালের তত্কালীন বৃটিশ সরকার বাহাদুরাবাদ-বালাসি ঘাট যমুনার ফেরি চালু করে স্বল্প সময়ের মধ্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে গত ১৩ বছর ধরে জেলাবাসী যমুনা নদীতে নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে গিয়ে ডাকাতের কবলে পড়ে, এমনকি নৌকাডুবিতে হাজারো মানুষের প্রাণ গেছে। এমতাবস্থায় জামালপুর-গাইবান্ধা জেলার সাথে সরাসরি সড়ক ও রেলওয়ে যোগাযোগের জন্য দ্বিতীয় যমুনা সেতু কিংবা যমুনা নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণ করে উত্তরাঞ্চলের ১৩টি জেলার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা হলে উত্তরবঙ্গের সাথে জামালপুর-শেরপুর-ময়মনসিংহ তথা রাজধানী ঢাকার দূরত্ব অনেক কমে যাবে। যাতায়াতও সহজ হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই জেলাবাসীর প্রাণের দাবি জরুরিভিত্তিতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু কিংবা টানেল নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নীত করে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
