দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়ন কর্মকান্ডে চলছে অযাচিত খবরদারি। আর এ কাজের নেতৃত্বে দেখা যাচ্ছে অনেকক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের। কোথাও কোথাও মন্ত্রী-এমপিদের কাছের বা পছন্দের লোকজনও জড়াচ্ছে এসব কর্মকাণ্ডে। এতে সরকার তথা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বিরক্ত হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বড় উন্নয়ন কার্যক্রম যেখানে দৃশ্যমান থাকার কথা, সেখানে কিছু জায়গায় মন্ত্রী-এমপিদের স্বজন কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের এমন আচরণে ম্লান হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি।
স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হত্যা থেকে শুরু করে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জমি দখল, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দখলবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্রকল্পে লুটপাটসহ নানা কর্মকান্ডে মূল কলকাঠি নাড়ছেন কতিপয় মন্ত্রী-এমপির স্ত্রী-সন্তানেরা। সঙ্গে তাদের পছন্দের কিছু বিতর্কিত নেতাকর্মী মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের কথার বাইরে গেলেই মন্ত্রী-এমপির রোষানলে পড়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। আবার কোথাও চলছে বাপ-বেটার শাসন। কেউ কেউ পরিণত হয়েছেন মূর্তিমান আতঙ্কে। কোনোভাবেই তাদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। নানা গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়া এমপি-মন্ত্রীদের আত্মীয়-স্বজনের নামের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। কোনো কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের নিয়েও দলীয় সমাবেশ করে বেড়াচ্ছেন। এতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় সাধারণ মানুষ যেমন আতঙ্কিত, তেমনি সরকার ও দলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। এরকম এমপিদের ভবিষ্যতে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একাধিকবার হুঁশিয়ারও করেছেন। কিন্তু এসব বিতর্কিত এমপিরাই আবার মনোনয়ন পাবেন বলে এলাকায় ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামায় সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি শ্রদ্ধা হারাচ্ছেন।
জানা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে এমপিদের আমলনামা। এ জন্য সরকারি ও দলীয় গোয়েন্দাদের একাধিক টিম কাজ করছে। এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন সরাসরি যাবে দলের হাইকমান্ডের কাছে। ইতিমধ্যে বর্তমান এমপি ও আসনভিত্তিক মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আমলনামাভিত্তিক একাধিক প্রতিবেদনও জমা পড়েছে। এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের তত্পরতা লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি তিনি বেশ কয়েকজন এমপিকে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে তাদের সংশোধন হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যক্তিগতভাবে নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
বিতর্কিত যে সব মন্ত্রী-এমপি: রাজবাড়ি সদরের এমপি কাজী কেরামত আলীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে রয়েছে অনেক অভিযোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নজের মওলা নাজু নামের এক যুবলীগ নেতা তার চাচাতো ভাইয়ের চাকরির জন্য এমপির স্ত্রীর কাছে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তবে চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত পাননি। সম্প্রতি নজের মওলা নাজুর সেই চাচাতো ভাই আত্মহত্যা করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রসঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও রাজবাড়ি সদরের এমপি কাজী কেরামত আলীকে পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনদের বেপরোয়া আস্ফাালন আগেকার সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের ছেলে মুহিত উর রহমান শান্ত ময়মনসিংহ শহরের এক আতঙ্কের নাম। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো পদে না থাকলেও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে বেড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে। বাবা মন্ত্রী হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের অনেক কাজও শান্ত দেখভাল করে থাকেন। হজযাত্রীদের ব্যাগ তৈরি, সরকারিভাবে হজযাত্রীদের তালিকা তৈরি, পূজা ও ঈদের বিশেষ বরাদ্দে তিনি প্রভাব খাটান বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ শহরের রাজনীতিতে প্রভাব রাখতে যুবলীগ নেতা শাহানুর ও এক ছাত্রলীগ নেতার বাড়িতে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছেন শান্ত। জেলায় জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব ব্যাপারে জানতে ধর্মমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সাতক্ষীরায় সংরক্ষিত আসনের নারী এমপি রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সারোয়ার রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। চাঁদাবাজি, মারপিট, তরুণীসহ আটক, গণপিটুনিসহ নানা কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এই এমপিপুত্র। সম্প্রতি চাঁদাবাজির দুই মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের আরেক এমপি পিনু খানের পুত্র বখতিয়ার আলম রনি ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের রাস্তায় রিকশার জট দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালান। এতে নিরীহ দুই ব্যক্তি মারা যান। ছেলের এই অপকর্মের কারণে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বাদ পড়েন পিনু খান।
একই বছর সাবেক এমপি এইচ বি এম ইকবালের ভাতিজা ফারিজ রহমান গুলশানের ব্যস্ত সড়কে কার রেসিংয়ে মেতে ওঠেন। এতে গাড়ির চাপায় মারাত্মক আহত হন চার ব্যক্তি। বেপরোয়া গতিতে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তিনি। এইচ বি এম ইকবাল ১৯৯৬ সালে ঢাকার রমনা-তেজগাঁও আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন।
দেশের তরুণসমাজ ধ্বংসকারী মাদক ইয়াবা চোরাচালানের ‘অঘোষিত গডফাদার’ হিসাবে আলোচিত টেকনাফের (কক্সবাজার-৪) এমপি আবদুর রহমান বদি এবং তার পাঁচ ভাই। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বদি ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে। পরে এ মামলায় তাদের সাজাও হয়। জানা গেছে, এমপি বদির স্ত্রী-ই তার অধিকাংশ অপকর্মের জন্য দায়ী।
রাজবাড়ি-২ আসনের এমপির নাম ব্যবহার করে অবাধে অবৈধ কাজ করে যাচ্ছে এমপির স্ত্রীর খুব কাছের মানুষ মজনু। সম্প্রতি মজনু ফোনে থানার ওসিকে বলেন, আমি এমপি জিল্লুল হাকিম বলছি, আপনি যাকে গ্রেফতার করেছেন তাকে ছেড়ে দেন। পুলিশ দুর্ধর্ষ এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছিল। কণ্ঠস্বরে সন্দেহ হলে পরে ওসি এমপির কাছে ফোন করে বিষয়টি জানতে চান। তখন এমপি বলেন, আমি তো কাউকে ছাড়তে বলিনি। পরে মজনুর বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। স্ত্রীর চাপে এমপি বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ওসিকে নির্দেশ দেন। ওই মজনুর বিরুদ্ধে পুলিশের পোশাক পরে চাঁদাবাজি করারও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের পোশাক পরিহিত তার একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, মসজিদ- মন্দিরের টাকা আত্মসাত্, এমপির নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন থানায় ফোন দিয়ে নিরীহ মানুষকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি, আবার উেকাচের মাধ্যমে তাদের ছাড়ানো, বিএনপির সন্ত্রাসীদের দলে এনে তাদের দিয়ে নানা অত্যাচারসহ বহু অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমপি জিল্লুর হাকিম কয়েকবার তাকে বের করে দিলেও এমপির স্ত্রীর সহয়তায় আবারও মজনু সব কাজ বহাল তবিয়তে করে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে মজনুর বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে রাজবাড়ি-২ আসনের সংসদ সদস্য জিল্লুল হামিক ইত্তেফাককে জানান, ওসির কাছে ফোন করে কোন সন্ত্রাসীকে ছাড়তে বলেননি মজনু। স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এই এমপি।
ঠাকুরগাঁওয়ে বাপ-বেটার শাসন চলছে -এমন কথা এলাকার সবার মুখে মুখে। ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলামের ছেলে হিন্দুদের জমি দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমপির ছেলের দাপটে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। জমি ফেরত চাইতে গেলে ওই পরিবারের লোকজনের ওপর এমপির বাহিনী হামলা করে। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রাজশাহী-৩ আসনের মেরাজ উদ্দিন মোল্লা হেরেছেন নতুন প্রার্থী আয়েন উদ্দীনের কাছে। এর আগে বিতর্কিত হওয়ায় তাকে দল থেকে মনোনয়নই দেওয়া হয়নি। জানা যায়, তার বড় ছেলে আবুল কালাম আজাদের নির্দেশে মোহনপুর থানা, মেজ ছেলে জালাল উদ্দীনের নির্দেশে পবা থানা চলত। আর ছোট ছেলে মোস্তাক ছিলেন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক এমপি আফাজ উদ্দীন আহমেদের দুই ছেলের কাছেও জিম্মি ছিল দৌলতপুরের মানুষ।
খুলনা-৬ পাইকগাছা-কয়রার এমপি অ্যাডভোকেট শেখ মো. নূরুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ এ এমপির পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারকে বাড়ি থেকে উত্খাত চেষ্টার। সে জন্য কয়েক ফুট উঁচু দেয়াল তুলে তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অমানবিক এ বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আলোড়ন তোলে দেশজুড়ে। এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েন এমপি নুরুল হক। পরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপে ওই দেয়াল ভাঙ্গা হয়েছে। সম্প্রতি এমপি নুরুল হক ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ কম্পিউটারে ফটোশপের মাধ্যমে ‘নিজের শরীরের অংশের’ সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মুখমন্ডল লাগিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেন। যার পরামর্শে তিনি এটা করেছিলেন তিনি এমপির স্ত্রীর খুবই কাছের মানুষ বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাকে হুমকি ও অস্ত্রসহ উত্তরার একটি বাড়িতে হামলা চালাতে গিয়ে নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় এবং স্কুল বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘক্ষণ রাজপথে দাঁড়িয়ে রেখে ভূমিমন্ত্রী ও পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম নিজেদের বিতর্কিত করেছেন। নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনায় উঠে আসে গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ ও তার স্বজনদের নাম।
খুলনার ফুলতলা-ডুমুরিয়ার সংসদীয় এলাকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও তার পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয়রা এসব অভিযোগ করে বলেন, দুই উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে জমি দখল, বিভিন্ন দফতরে চাকরি বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব রয়েছে। মামলার ভয়ে এ নিয়ে মুখ খোলেন না এলাকার লোকজন।
গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর-গাজীপুর সদরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য রহমত আলীর পুত্র জামিল হাসান দুর্জয় নানা অপকর্মে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে জমি জবরদখল, বালুমহাল, জুট ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, টিআর-কাবিখা লুট, বন কেটে উজাড় সবকিছুর পেছনেই সংসদ সদস্য রহমত আলীর ছেলেকে অভিযুক্ত করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।
টাঙ্গাইল-৩ আসনের সরকার দলীয় সদস্য আমানুর রহমান খান রানার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ছাড়াও রয়েছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ। স্থানীয় জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহম্মেদ হত্যাকান্ডে গ্রেফতারকৃতরা এ ঘটনায় আমানুর রহমান রানার সম্পৃক্ততা রয়েছে দাবি করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি ও তার তিন ভাই- মুক্তি, বাপ্পা ও কাঁকন। ফারুক আহম্মেদ হত্যা মামলায় জামিন নিতে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন আমানুর রহমান খান রানা। আদালত জামিন না দিয়ে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করে। সেই থেকে কারাগারেই রয়েছেন তিনি।
যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য রণজিত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, অভয়নগরে কাউন্সিলর মোল্লা ওয়ালিয়ার রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনে মদদ রয়েছে তার স্বজনদের। এ ঘটনায় রণজিত কুমার রায়ের বিচার দাবি করে সম্প্রতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। একসময়ের কানসাট আন্দোলনের এ নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হন। এর পরপরই বদলে যেতে থাকে তার আচরণ। সন্ত্রাস, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ বাণিজ্য, টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দলের ভেতরে কোন্দল সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে গোলাম রব্বানী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে।
ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহ ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে নিজ দলের কর্মী আজিজুল হককে গুলি করে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার কুশপুত্তলিকা দাহ এবং শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন। এ ঘটনায় ওই এমপির বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়।
সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আফম রুহুল হক তার স্ত্রী-পুত্রের কারণেই মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন-এ কথা স্বাস্থ্য সেক্টরের সবারই জানা। স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার নামে খ্যাত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু কনট্রাকটারের সাথে মন্ত্রীর পুত্র ও স্ত্রীর সখ্য গড়ে ওঠে। মন্ত্রী থাকাকালে প্রথমে রুহুল হক ওই ঠিকাদারকে পাত্তা দিতে চাননি। কিন্তু পুত্র ও স্ত্রীর চাপে পড়ে রুহুল হক মিঠু সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়তে হয় মন্ত্রীকে। ঠিকাদার মিঠু ও মন্ত্রীর পুত্র যৌথভাবে রাজধানীর শ্যামলিতে সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে রুহুল হকের মন্ত্রিত্ব নেই। তবে তিনি আছেন সংসদ সদস্য পদে। এ পদেরও অপব্যবহার করছেন মন্ত্রীর স্ত্রী-পুত্র। মন্ত্রীর ঢাকার উত্তরার বাড়িতে সার্বক্ষণিক ভিড় করেন সাতক্ষীরার জামায়াত, শিবির ও বিএনপি নেতারা। রুহুল হকের স্ত্রী-পুত্ররা নিয়মিত তাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন দলে পদ দেওয়া ও মামলা থেকে রক্ষা করানোর আশ্বাস দিয়ে। কালিগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি নূর মোহাম্মদ ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে রুহুল হকের স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তবে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় তাকে দলে ভিড়াতে সমস্যা হচ্ছে। এদিকে রুহুল হকের স্ত্রী-পুত্রের কাছে ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আসেন মুজিবর রহমান। এলাকায় অঘোষিত জামায়াতের আমীর হিসেবে পরিচিত এই মজিবর রহমান। একে নিয়ে এখন চরম বিপাকে পড়েছেন রুহুল হক। সম্প্রতি দেবহাটা থানার ওসিকে তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মুজিবর রহমান সব সময় জামায়াত-শিবিরের লোকদের সাথে থাকেন। আমার কাছে না শুনে তার কথায় কোন কাজ করবেন না।
এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক ইত্তেফাককে বলেন, মিঠু ঠিকাদারের সাথে ব্যক্তিগত কোন সম্পর্ক আমি কিংবা আমার পরিবারের কারোর ছিল না। তিনি বলেন, মন্ত্রী থাকাকালে তিনি স্বাস্থ্য সেক্টরের উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ কাজ করে গেছেন। স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার পেয়েছে। মন্ত্রী থাকাকালে এবং বর্তমানে তার স্ত্রী-সন্তানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করেন তিনি।
অসহায় প্রশাসন:সংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদ সদস্য এবং তাদের স্বজনদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সংঘঠিত এসব অপকর্মে ক্ষুব্ধ হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে নিতে পারছে না কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ। এসব ঘটনা যদি মিডিয়ায় প্রচার হয় এবং সরকারের ওপরমহলের সবুজ সংকেত মেলে, শুধু সে ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা চাপে ‘ধীরে চল নীতি’ অনুসরণ করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। বিষয়টি ক্ষমতাসীন দলের কোনো পর্যায়েরই নীতি নির্ধারকরা ভালো চোখে দেখছেন না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংসদীয় দলের একাধিক সভায় এসব বিতর্কিত সংসদ সদস্যকে সতর্ক করেছেন। ভবিষ্যতে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। এরপরও অনেক এমপি ও তাদের ঘনিষ্ঠরা অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন।
নৌকার টিকিট পাচ্ছেন না ৭০ এমপি: বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৭০ এমপি নৌকার টিকিট পাচ্ছেন না বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে। দলের নেতারা জানান, আগামী নির্বাচনকে তারা খুব ‘সিরিয়াস’ মনে করছেন। যেসব এমপি অসদাচরণ করেন, দলকে পাত্তা না দিয়ে নিজের খেয়াল খুশি মতো পছন্দের গোষ্ঠী তৈরি করে চলছেন, দুর্দিনের কর্মীদের কাছে নিচ্ছেন না এবং যারা পাস করে আসতে পারবেন না এমন এমপিদের আগামী নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দলীয় ফোরামে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে দলের যেসব সংসদ সদস্যকে বারবার চেষ্টার পরও সংশোধন করা সম্ভব হয়নি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। কে কী করছেন, তার রিপোর্ট তার কাছে আছে। নিয়মিত এসব তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। এলাকায় যার অবস্থান ভালো না, তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। দলের হাইকমান্ডের এমন বক্তব্যের পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত সংসদ সদস্যরা।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে না। নিজ নিজ এলাকায় যেসব এমপি বিতর্কিত, আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের স্থলে জনপ্রিয়দের মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিতর্কিত এমপিদের আসনে বিকল্প প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে বলে তিনি জানান ।
(ইত্তেফাকের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা সংবাদদাতা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে)
ইত্তেফাক/নূহু
