রঙ্গভরা ভোট ও ভোটের রাজনীতি

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫০

আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই হচ্ছে হৈহৈ কাণ্ড রৈরৈ ব্যাপার। তা সে স্কুল পরিচালনা কমিটি কিংবা বাজার পরিচালনা কমিটিই হোক, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার পদে নির্বাচনই হোক। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে তো কোনো কথাই নেই। জাতীয় সংসদ সদস্য বা এমপি মানে বিরাট সুযোগ, বিশাল সম্মান। এমপি মানে জাতির মাথা হওয়া। তারা দেশবাসীর জন্য আইন বানান, সংসদে গিয়ে জনগণের কথা বলেন। দেশবাসী সঙ্গত কারণেই বর্তে যান, কৃতজ্ঞ হন। দেশের মানুষ পাঁচ বছরে একবার ভোট দেন। আর সেই ভোটের বিনিময়ে এমপি সাহেবরা পুরো পাঁচ বছর দেশবাসীর দেখাশোনা করেন।

এমপি নির্বাচন বা এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতাকে ঘিরে আমাদের দেশে এখন পুরোদমে হৈহৈ কাণ্ড রৈরৈ ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্ব্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন নিয়ে এখন দেশব্যাপী চলছে সাজসাজ রব। এমপি প্রার্থীরা সব গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। অনেকেই ‘ঘোড়া বদলের’ ফিকিরে আছেন। অনেকেই আবার জোট বদল, মার্কা বদল, এমনকি নেতা বদলের তালে আছেন। মনোনয়ন পেতে, বড় দলের ছাতার তলে আশ্রয় নিতে এমপি-প্রার্থীরা আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে—কেউ জানে না। তবু মনোনয়ন পাবার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘যদি লাইগ্যা যায়’—এই আশায়!

তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতি দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। না, এই ভাগাভাগিটা চিরাচরিত শোষক-শোষিত ধনী-গরিব বা আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়; ভাগাভাগিটা হচ্ছে ভোটার ও ভোটপ্রার্থীর। দেশের জনগণ বর্তমানে দুই শিবিরে বিভক্ত; একদল ভোটার অন্যরা ভোটপ্রার্থী। দুইপক্ষই ব্যস্ত, উত্তেজিত। ভোটপ্রার্থীদের চোখে ঘুম নেই। বিশ্রাম নেই। নেই কোনো অবসর। শেষ সময়ে মরিয়া চেষ্টা যদি যদি মনোনয়নটা বাগানো যায়। মনোনয়ন পাবার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা সবকিছু করছেন বা করতে প্রস্তুত আছেন।

এদিকে ভোটাররাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। শেষপর্যন্ত কে কোন ‘ঘোড়া’য় চেপে তাদের সামনে উপস্থিত হন, তা দেখার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে। একইসঙ্গে ভোটপ্রার্থীদের সালাম নিতে হচ্ছে, ‘দোয়া’ করতে হচ্ছে।

ভোটের অনেক গুণ আছে। ভোট আমাদের নিরানন্দ জীবনে নিয়ে আসে উত্সবের আমেজ। সাধারণ মানুষ আলোচনার খোরাক পায়। ভোটের প্রায় এক মাস আগে থেকে শুরু হয়ে এক মাস পর পর্যন্ত এ আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। তবে ভোটের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে ভোট ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, জাত-পাত সবকিছু ঘুচিয়ে দেয়। উদ্ধত মাস্তান, অহঙ্কারী বুদ্ধিজীবী সাবেক মন্ত্রী, হোমরা-চোমরা প্রভাবশালী, সহায়-সম্বলহীন দীনভিখারি সবার পরিচয় কেবল ভোটার। বুদ্ধিজীবীর ভোট, মন্ত্রীর ভোট, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর ভোট আর একজন সাধারণ ভিখারির ভোটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবারই একটি মাত্র ভোট। সবাই ভোটার এবং সবার ভোটের সমান দাম। ভোট ভোটারদের মহিমান্বিত করে। এদেশে ভোটের সময় ছাড়া অন্য সময়ে ভোটাররা খুব একটা মর্যাদা বা সম্মান পান না। কিন্তু ভোটের সময় ভিন্ন পরিস্থিতি। ভোটে যে প্রার্থীই জয়ী হোক, তাতে সাধারণ ভোটারদের তেমন একটা লাভ-লোকসান হয় না। তবু ভোটাররা ভোট এলে উদ্দীপ্ত হয়। উত্তেজনা অনুভব করে। ভোটের সময় ভোট প্রার্থীরা সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে। সুখ-দুঃখের কথা জিজ্ঞেস করে। নিজের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না, তেমন কোনো কল্যাণ হবে না জেনেও ভোটাররা ভোটের সময় উল্লসিত হয়। ভোটের ব্যাপারে উত্সাহ দেখায়।

নির্বাচনে জয়ের জন্য কোনো কোনো প্রার্থী অর্থ-অস্ত্র-পেশীশক্তি, শ্রম-ঘাম সবকিছু বিনিয়োগ করেন—এর কারণ কী? ভোট নিয়ে নানা ধরনের রঙ্গ-তামাশা শুরু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই ভোটপ্রার্থীরা দলে দলে ভোটারদের বাড়ি যাচ্ছেন। তাদের মন গলানোর, মিষ্টি কথায় ও প্রতিশ্রুতিতে ভোলানোর চেষ্টা করছেন। ভোটাররা ইদানীং কম যায় না। তারাও মোটামুটি সেরের ওপর সোয়া সের। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একজন প্রার্থীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইলেকশনে জেতার পর আপনার প্রথম কাজ কি হবে? প্রার্থী ভদ্রলোক অত্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অকপটে জবাব দিয়েছিল, ইলেকশনে যে টাকাটা খরচ হবে, সে টাকাটা কয়েকগুণ সুদসহ উঠানোর চেষ্টাই হবে আমার প্রথম পদক্ষেপ। এ কথাটা আমাদের প্রার্থীরা সবাই যদি দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারত, তাহলে দেশ হয়তো অনেক মিথ্যাচার ও পাপ থেকে রক্ষা পেত!

ভোট রঙ্গের কোনো তুলনা নেই। এর কোনো শেষও নেই। এক প্রার্থী কোনো একদিন এক ভোটারের বাড়ি দেখা করতে এলো। ভোট দাতাকে কথাপ্রসঙ্গে ভোট প্রার্থী বললেন, আপনার ভোটটা আমি পাচ্ছি তো?

ভোটদাতা উত্তর দিল: দেখুন আমি খুব দুঃখিত। অন্য প্রার্থীকে ভোট দেবো বলে আমি আগেই কথা দিয়ে ফেলেছি। ভোট প্রার্থী ভদ্রলোক এবার হেসে উঠলেন। বলল, আরে তাতে কী হয়েছে? আপনি দেখছি এখনও ছেলেমানুষ আছেন। রাজনীতিতে ও নির্বাচনে কথা আর কাজের মধ্যে অনেক ফারাক। কথা দিলেই তা রাখতে হবে—এমন কোনো কথা আছে নাকি? এবার ভোটদাতা সন্তুষ্টচিত্তে বলল: তা-ই যদি হয়, তাহলে আপনাকে কথা দিতেও আমার কোনো আপত্তি নেই।

নির্বাচনে শরিফ দাঁড়িয়েছেন আনারস মার্কায়, আর জলিলের মার্কা ছাতা। একদিন রাস্তায় কথা হচ্ছিল তাদের।

শরিফ: বুঝলা জলিল, ভোটে কিন্তু আমিই পাস করব। কেন জানো? আমার দলের কর্মীরা যখন রিকশায় ওঠে, রিকশাওয়ালার খোঁজ-খবর নেয়। রিকশা থেকে নামার সময় তাকে ১০ টাকা বকশিশ দেয়। আর বলে, ‘ভাই, ভোটটা কিন্তু আনারস মার্কায়ই দিয়েন।’

জলিল: না রে শরিফ, ভোটে আমিই জিতব। কারণ, আমার লোকেরা রিকশায় উঠেই রিকশাওয়ালাকে গালিগালাজ করে। রিকশা থেকে নামার সময় ১০ টাকা কম দেয়। আর বলে, ‘ওই ব্যাটা, ভোটটা কিন্তু আনারস মার্কা দিবি।’

মঞ্চে দাঁড়ায়ে  বক্তৃতা করছিলেন এক নেতা, ‘আমি যদি নির্বাচিত হই, এই গ্রামে ব্রিজ বানি দেব।’

পেছন থেকে একজন বলে উঠল, ‘স্যার, এই গ্রামে তো কোনো খাল নেই। ব্রিজ করবেন কীভাবে?’

নেতা আমতা আমতা করে বললেন, ‘ইয়ে মানে... প্রথমে খাল খনন করব। এরপর খালের ওপর ব্রিজ বানাব।’

 ভোটের রাজনীতি বড়ই রঙ্গভরা!

n লেখক : রম্যরচয়িতা