কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের আর মাত্র ৬ দিন বাকি। নির্বাচনে জয়ী হতে দেশের বড় দুই দল ও জোটই সমানতালে চষে বেড়াচ্ছেন গোমতী পাড়ের নগরী। নির্বাচন যতোই ঘনিয়ে আসছে উভয় দল ও জোটের নেতারা ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ এমনিভাবে নগরীর আনাচে-কানাচে চালিয়ে যাচ্ছেন লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগসহ ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচনী ফলাফল কি হয় এ নিয়ে স্নায়ুচাপে রয়েছেন মেয়র পদে দুই প্রার্থী ও তাদের দলসহ জোটের নেতারা।
জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুসিকের প্রথম নির্দলীয় নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগে ‘দ্বিধা-বিভক্তির’ কারণে মেয়র পদে মনিরুল হক সাক্কুর কাছে হেরে যান প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আফজল খান। এ বছর দলীয় প্রতীকের এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন তার মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমা। দলীয় সরকার ক্ষমতায়। তাই নৌকার বিজয়কে নিজেদের মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছেন দল ও জোটের নেতারা।
জানা গেছে, গত ৫ বছরে নগরীর দক্ষিণ এলাকার ৯টি ওয়ার্ড ছিল একেবারেই অবহেলিত, নগর উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি ওই সব এলাকায়। তাই গত নির্বাচনে যারা সাক্কুকে পছন্দ করে নির্বাচিত করেছিলেন তাদের অনেকেই এবার নয়া নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন। ভোটের মাঠে ওই এলাকায় সাক্কুর প্রতি চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক ভোটার। এছাড়া গত নির্বাচনে স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সাক্কুর পাশে ছিলেন, এ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী সাক্কুর পাশে জামায়াতকে দেখা যাচ্ছে না। সাক্কু জানান, আজ শুক্রবার তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।
১৪ দলের সংবাদ সম্মেলনে
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার পক্ষে গণসংযোগে কুমিল্লায় এসে গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেছে ১৪ দল। এ সময় ১৪ দলীয় জোটের নেতা ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘কুমিল্লা নগরীর উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগের দুই মন্ত্রী ও এমপি অঢেল অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন, কিন্তু বরাদ্দ অনুযায়ী উন্নয়নের ছিটেফোটাও হয়নি। তাহলে এ টাকা গেল কোথায়, পিঁপড়ায় খেয়ে ফেললো কি না। তিনিই (সাক্কু) বিএনপির একমাত্র ভাগ্যবান মেয়র যিনি জেলে যান নাই, তিনি কিসের জন্য জেলে যান নাই তা আমরা জানি না। সাক্কু কারাগারে থাকলে হয়তো বলা যেত সরকারি বরাদ্দের টাকা তিনি আত্মসাত্ করেন নাই, কিন্তু তিনি তো কারাগারে যাননি। কুমিল্লা নগরীর উন্নয়নের পরিবর্তে সরকারি বরাদ্দের টাকায় সাক্কু নিজের উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি করেছেন।’ তিনি আরো বলেন, মেয়র প্রার্থী সাক্কুর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ ১০টি মামলা রয়েছে। সীমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা কোনো মামলা নেই উল্লেখ করে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী সীমাকে বিজয়ী করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম বলেন, বিএনপির মেয়র কোনো কাজ করেননি। কুমিল্লা শহর আজ যানজট আর জলাবদ্ধতার শহর।
এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, সুজিত রায় নন্দী, জাসদের ফজলুর রহমান, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদত্ হোসেন, তরিকত ফেডারেশনের মোহাম্মদ আলী ফারুকী, কমিউিনিস্ট পার্টির অসিত বরুন রায়, ন্যাপের (মোজাফফর) সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ নজরুল মজিদ বেলাল, গণআজাদী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ, কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক আলহাজ ওমর ফারুক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কর্ণধার নাফিসা কামাল, ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা মাহমুদুল হাসান মানিক প্রমুখ উপাস্থিত ছিলেন।
নৌকার পক্ষে ভোট চাইলেন এমপি
বৃহস্পতিবার নগরীর নজরুল এভেনিউ এলাকায় মডার্ণ কমিউনিটি সেন্টারে বঙ্গবন্ধুর ৯৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লাস্থ মুরাদনগর সমিতির সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলার মুরাদনগর আসনের এমপি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। অনুষ্ঠানে যোগ দেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা। অ্যাড. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন এনামুল হক শামীম, দেবিদ্বার আসনের এমপি রাজি মোহাম্মদ ফখরুল, সুজিত রায় নন্দী, অধ্যক্ষ আফজল খান, ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ প্রমুখ। এসময় তারা নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নগরবাসীর নিকট ভোট চান।
আওয়ামী লীগের গণসংযোগ
আওয়ামী লীগ প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর নজরুল এভেনিউ, মোগলটুলী এলাকায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করেন। তিনি দুপুরে কুমিল্লা জিলা স্কুল ও বিকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে ২টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ‘জনতার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এসময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিকালে ১৪ দলীয় জোটের নেতা দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নগরীর কান্দিরপাড়, বজ্রপুর, মৌলভীপাড়া, তেলিকোনা, সংরাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকার পক্ষে গণসংযোগ করেন।
বিএনপির পক্ষে গণসংযোগ
বৃহস্পতিবার বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে নগরীর ঠাকুরপাড়া, অশোকতলা, গোবিন্দপুর, পাথুরিয়াপাড়া, টিক্কারচরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গণসংযোগ চালান। তিনিও দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ‘জনতার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বিকালে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচন সমন্বয়ক এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল আদালত, মোগলটুলী, রাজগঞ্জ, ছাতিপট্টি, চকবাজার এলাকায় ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করেন। এসময় কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গনি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মুর্তুজাসহ জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম খান, এমরান সালেহ প্রিন্স, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন, আবদুল আউয়াল খান, বেলাল আহমেদ, সালাহ উদ্দিন শিবির, একরামুল হক বিপ্লব, নগরীর ঠাকুরপাড়া, অশোকতলা, উত্তর চর্থা, নানুয়া দিঘীরপাড়, বজ্রপুর, তামুকিয়াপাড়া এলাকায় গণসংযোগ চালান।
ইত্তেফাক/নূহু
