গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দৃঢ় অঙ্গীকার

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৭, ১৫:১৭
 
গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দৃঢ় অঙ্গীকারে মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পালিত হলো ২৫ মার্চ কালোরাত ও গণহত্যা দিবস। এ উপলক্ষে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন, বাংলাদেশ কনস্যুলেট, জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠন নানান কর্মসূচি পালন করে।
 
জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন একাত্তরের ২৫ মার্চের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত, নিষ্ঠুর ও নিকৃষ্টতম গণহত্যার স্মরণে প্রথমবারের মতো ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করে। স্থানীয় সময় শনিবার বেলা ৩টায় মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে ২৫ মার্চ কালরাতের শহীদসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের স্মরণে দোয়া ও একমিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। এরপর ২৫ মার্চের গণহত্যার উপর একটি প্রামাণ্য ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
 
উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য বর্তমান সরকার গৃহীত পদক্ষেপ সর্বশক্তি দিয়ে বাস্তবায়ন করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইতোমধ্যে আমরা জাতিসংঘের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টার সাথে দেখা করে সরকারের এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং এটি জাতিসংঘে উত্থাপনে বাংলাদেশের উদ্যোগের বিষয়টি অবহিত করেছি। এছাড়াও জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিকীকরণের অংশ হিসেবে এ বিষয়ে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের সম্ভাব্য সবধরণের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। গণহত্যার বিষয়ে সমমনা বন্ধু রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশ ও গণহত্যা কবলিত দেশসমূহকে নিয়ে জাতিসংঘে ও অন্যান্য বৈশ্বিক প্লাটফর্মে ২৫ মার্চের গণহত্যার পক্ষে একযোগে কাজ করার ওপর গুরুত্বরোপ করেন স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। তিনি এক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালি, এনজিও, সুশীল সমাজ, মিডিয়া, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও গবেষকসহ সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
 
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শামীম আহসান ২৫ মার্চের বর্বরোচিত হত্যাকা্ল বিশ্বমানবতাকে পরাজিত করেছিল উল্লেখ করে প্রবাসী বাঙালিদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা অনেকেই এদেশের নাগরিক। আপনাদের সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এই গণহত্যার কথা তুলে ধরা। প্রবাসে গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে সারা বিশ্ব ১৯৭১ এর প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
 যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আসুন দলমত নির্বিশেষে মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল সপক্ষ শক্তি ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির জন্য একযোগে কাজ করি।
 
মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বক্তব্য দেন ড. মহসিন আলী ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনসুর খান। অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন জেনোসাইড-৭১ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ড. প্রদীপ রঞ্জন কর, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ বসারত আলী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ডা. মাসুদুল হাসান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমেদ ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইরিন পারভীন।
জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন
এদিকে জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন গণহত্যা দিবস উপলক্ষে শনিবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজা মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে কালরাতের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিক সাপ্তাহিক বাঙালী সম্পাদক ও সাহিত্য সমালোচক কৌশিক আহমেদ।
জেনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. প্রদীপ রঞ্জন করের সভাপতিত্বে এবং কবি ও আবৃত্তিকার গোপন সাহার সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনালের মো. শামীম আহসান, সাংস্কৃৃতিক ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরশীদ আরোয়ার বাবলু, গোলাম মোস্তফা খান মিরাজ, সুব্রত বিশ্বাস, লুত্ফুন নাহার লতা, ওবায়দুল্লাহ মামুন, মিনহাজ আহমেদ, কৃষিবিদ আশরাফুজ্জামান, সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ সোহাগ, নূরে আলম জিকু, ফাহিম রেজা নূর প্রমুখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে জোনোসাইড ’৭১ ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের সংসদে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের কাজকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি পেতে ৪৬ বছর আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
আলোচনা সভায় বক্তারা ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস না বলে ‘জেনোসাইড ডে’ হিসাবে পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, একাত্তরে বাংলাদেশে যত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বিশ্বের আর কোনো দেশে এত বড় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়নি। বক্তারা আন্তর্জাতিক জেনোসাইড ডে’র স্বীকৃতি আদায়ে প্রবাসী বাঙালি, এনজিও, সুশীল সমাজ, মিডিয়া, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও গবেষকসহ সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শহীদ হাসান, শফি চৌধুরী হারুন ও তাহমিনা শহীদ। এছাড়া কবিতা আবৃত্তি করেন মুমু আনসারী, খুরশীদ আনোয়ার বাবলু, নাহিদ নজরুল, শুক্লা রায় প্রমুখ।
ঘাতক দালাল নিমূল কমিটি, নিউইয়র্ক
২৫ মার্চ কালরাত ও গণহতা দিবসের স্মরণে শনিবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় সমাবেশে করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার, সেক্টার কমান্ডারস ফোরাম এবং মুক্তিযুদ্ধ ৭১।
সমাবেশে বক্তারা ২৫ মার্চে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার নিন্দা জানিয়ে দিনটিকে জেনোসাইড ডে হিসাবে আন্দর্জাদিক স্বীকৃতি আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা খান মিরাজ, শহীদ হাসান, আব্দুল মুকিত চৌধুরী, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, কবীর আনোয়ার, মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহম্মেদ, ড. রফিক আহমেদ, সুব্রত বিশ্বাস, শীতাংশু গুহ, হাকিকুল ইসলাম খোকন, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান ফাহিম রেজা নূর, মিনহাজ আহমেদ, নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি ফাহাদ সোলায়মান, আকবর হায়দার কিরণ, শিবলী সাদেক, দুরুদ মিয়া রণেল প্রমুখ।
 
ইত্তেফাক/মণ্ডল