আমাদের ইংরেজি ভীতি

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫২

এইচএসসি-তে পাসের হারের নিম্নগামিতার পেছনে আছে ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্যতা। এটি বিগত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিদেশি এই ভাষায় পারঙ্গমতা অর্জন দূরে থাকুক, পাস নম্বর তুলতে হিমসিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

আমাদের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ইংরেজি শিক্ষার অবস্থানটা কেমন? শুধু ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা ছাড়া, ইংরেজি বলা কিংবা লেখার অভ্যাস আমাদের শিশুদের শৈশব থেকে গড়ে ওঠে না। আমরা প্রি স্কুল থেকে প্লে গ্রুপ, নার্সারি, কেজি ইত্যাদিতে শিশুদের ওপর একাধিক নামে, ছবি সম্বলিত ইংরেজি বইগুলো চাপিয়ে দেই ঠিকই, কিন্তু একটা বয়সের পর এইসব কিছু ছেড়ে শিশুরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। অন্যদিকে, শিশুদের ইংরেজি সিলেবাস মূলত হওয়া উচিত তাদের বয়স, উপযোগিতা ও আনন্দের উত্স হিসেবে। অথচ এদেশে গ্রামার শিক্ষার নামে দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণি থেকে শুরু হয় শিশুদের বই আর নিয়মের বোঝা।

এই শিশুটি বড় হলে একসময় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তার বিগত বছরের জ্ঞান। ফলাফল—বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীরাও জানেন না, এমনকি তাঁদের নামের বানানটা হতে হবে ইংরেজি বড় হাতের, নামের সবগুলো পর্ব বড় হাতের অক্ষরে লিখতে হয়। উদাহরস্বরূপ বলতে হয়, একজনের নাম সাবিনা আক্তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন নামটি লিখছেন বড় হাতের S দিয়ে (সাবিনা)  আর আক্তার লিখতে শেষ করছেন ছোট হাতের a দিয়ে ।

আমাদের চারপাশের পরিবেশ বলাবাহুল্য, ইংরেজিবান্ধব নয়। ইংরেজি বলা ও লেখায় সাধারণ মানুষের উত্সাহ সৃষ্টি দূরে থাকুক, অনেকেই জানা সত্ত্বেও এটি প্রকাশ করতে কুণ্ঠিত থাকেন। অথচ Communicative English কোনোদিনই বলা ও লেখার চর্চা ছাড়া পরিপূর্ণতা পেতে পারে না। আবার  সেই তৃতীয় শ্রেণি থেকে আমরা গ্রামারের প্রতিটি বিষয় একসঙ্গে শিশুদের মগজে ঢোকানোর চেষ্টা করি। এখন শিশুদের মেধাগত অবস্থানের ভিন্নতার কারণে এটি শুধু বাহ্যিক সিলেবাস শেষ করার প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে,  তা কোনো কাজে আসছে না। যেমন, একটা শিশু যখন সব লেটার বা অক্ষরগুলো চিনবে বা চিনতে শিখবে তখনই সে শব্দ  তৈরিতে মনোযোগ দিতে পারবে। আবার যখন শব্দ তৈরি শেষ হবে, তখনই সে পদবিন্যাস (parts of speech)-এ যেতে পারবে। এরপর তার সময় বা কাল বিভাজন (tense), বাক্যের রূপ অর্থ ও গঠন অনুসারে সপষ্ট করার প্রয়োজন হবে। শিশুরা বাক্যের প্রকৃতি পরিবর্তন (Transformation), উক্তি পরিবর্তন  (speech), বাক্যের পরিপূর্ণ রূপদান (completing sentence), প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া (tag), সংযোজক  (connectors) ইত্যাদি বিষয়ে শিখতে থাকবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এইসব বিষয়ে সীমিত পাঠদান এবং শুধু কোনো রকমে সিলেবাস শেষ করার তাগাদা থেকে শিশুরা পুরো দশটি বছর মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয় থেকে যে জ্ঞান লাভ করে তা যত্সামান্য। কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদান বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে। দেখা যাচ্ছে, শুধু  প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে, পাস করার নিশ্চয়তা থেকে ইংরেজি শিখতে ঝুঁকছে কেউ কেউ,  পারিবারিক আর্থিক অবস্থান বিচার করলে যেসব শিক্ষার্থী টিউশন নিতে পারছে না, তারা শুধু বিদ্যালয়মুখী হয়ে পাস করতে পারছে না। অন্যদিকে communicative English-এর একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে Reading Test, অথচ আজকালের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি পড়তে সবচেয়ে বেশি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এখানে শিশুদের সহজ উচ্চারণবিধি শিখিয়ে পড়াতে শেখান না কোনো শিক্ষক, এটাকে সময়ের অপচয় মনে করেন। একইভাবে, শিশুদের শোনার (Listening Test) দক্ষতাও গড়ে উঠছে না সেইভাবে,  যেহেতু শিশুদের পাঠদান প্রক্রিয়ায় একটা বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

এইভাবে, না জেনে, না বুঝে (মূলত কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আগ্রহ সৃষ্টির ব্যর্থতাকে দায়ী করব) আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠছে ব্যাপক ইংরেজি ভীতি নিয়ে, যা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও দূর করা যায়নি। সেই ভীতি দূর করার সময় এসেছে, শুধু চাই যুগোপযোগী উদ্যোগ।

ঢাকা