দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বর্তমান চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সততা লইয়া কাহারো মনে প্রশ্ন নাই। তবে দুদক এমন একটি সংস্থা যেইখানে সততার সহিত কাজ করিতে চাহিলেই করা যায় না। তিনি বিভিন্ন সময় এইসকল বিষয়ে অনেক কথা বলিয়াছেন। ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখে একটি মতবিনিময় সভায় তিনি স্পষ্টতই বলিয়াছেন যে, ‘আমার লোকেরা পয়সার বিনিময়ে অনুকম্পা দেখিয়েছে—আপনারা এটা বলতেই পারেন। আমরা কেউ-ই ধোয়া তুলসী পাতা নই। আমাদেরও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে।’ জনাব ইকবাল মাহমুদ একঅর্থে অসহায়ত্ব প্রকাশ করিয়াছেন তাহাদের সীমাবদ্ধতা লইয়া। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমরা লাখ লাখ অভিযোগ পাই ১০৬ নম্বরে। তার মাত্র ২ ভাগ আমার আওতায়। বাকি ৯৮ ভাগ আমরা সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠাই।’ তিনি স্বীকার করিয়াছেন, দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার কারণে অনেক কিছুই দুদক সম্মুখে আনিতে পারে না। কেবল তাহাই নহে, তিনি প্রায়শই বলিয়া থাকেন যে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি দমন করা যায় না। তিনি মনে করেন, এখন মানুষের আর অভাব নাই। লোভেই দুর্নীতি করে। লোভের একটি সীমা আছে। তিনি সীমাহীন লোভের বাড়ন্ত জিহ্বা কাটিয়া দেওয়ার কথাও বলিয়াছেন সময়ে সময়ে। কিন্তু তাহার কথা যেন দিনশেষে নখ-দন্তহীন বাঘের হুঙ্কারের মতো শোনায়।
নদীবিধৌত চাঁদপুর জেলায় ইকবাল মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৫ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর বয়সী তিনি আরো অনেকের মতোই একটি ন্যায়নীতিপূর্ণ সুন্দর রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন নিশ্চয়ই। ১৯৭২ সালে তিনি মাধ্যমিক পাস করিয়া ভর্তি হইয়াছিলেন ঐতিহ্যবাহী নটরডেম কলেজে। ছাত্রজীবনে সম্পৃক্ত ছিলেন ছাত্ররাজনীতির সহিত। উচ্চশিক্ষার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন, পিএইচডি করেন লোকপ্রশাসনের ওপর। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি হইতে বিসিএস ক্যাডার (জনপ্রশাসন) হিসাবে দেশের সেবা করিয়া আসিতেছেন তিনি। কাজ করিয়াছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক সংস্থায়। অবশেষে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পাইয়াছেন ২০১৪ সালের ১৪ মার্চে। দীর্ঘ ৩৮ বত্সরের কর্মজীবনে আমরা তাহার সততা ও কর্মনিষ্ঠার অপূর্ব নজির দেখিতে পাইয়াছি।
কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর যেই দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর স্বদেশের কথা তিনি চিন্তা করিয়াছিলেন, বিভিন্ন সময় দেশসেবার বিভিন্ন দায়িত্ব পাইয়া অবশেষে দুদকে আসিয়া তিনি কি কখনো আনমনে রোমন্থন করেন সেই ন্যায়নীতিপূর্ণ সুন্দর একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন? তিনি কি দিনশেষে দেখিতে পান না যে, তাহার সকল স্বপ্ন ছাই হইয়া যাইতেছে হুতাশে? তিনি কি নিভৃতে তাহার সবচাইতে বিশ্বস্ত একান্ত আপনজনকেও কখনো বলিয়াছেন যে, তাহার হস্তে অর্পিত কথিত স্বর্ণপাত্র আসলে ছাইভস্মে পূর্ণ? কিংবা যাহা বলিতে চাহেন তাহা তিনি কি তাহার একান্ত আপনজনকেও বলিতে পারেন? তাহার স্বপ্নভরা পাত্রখানি কি ক্রমশ ছাইয়ে ভরিয়া যাইতেছে না?
