অতি লোভের সীমা লঙ্ঘনের পরিণাম

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৫

আমরা লাভের পেছনে দৌড়াই সুখের জন্য। লাভের অপর পিঠে আছে লোভ। তবে লোভের একটি সীমা থাকা উচিত। অতি লাভের জন্য সাগরে-অনলে-স্বখাদ সলিলে কোথাও ঝাঁপ দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অতি লাভের জন্য অনেকেই অতি লোভে পড়েন। অতি লোভের আগুনে নিজে মরেন, অন্যকেও মারেন।

লোভ শব্দটি নেতিবাচক শোনালেও এটা সত্য যে, লোভের হাত ধরেই লাভের ঘর পূর্ণ হয়। পুঁজিবাদে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে লোভ। লোভের অন্য অর্থ করা যায় মুনাফা হিসেবে। কিন্তু অতি লোভ ভালো নয়। এটা হলো অতি সুখের সন্ধানে ছুটতে থাকা মরীচিকার মতো। ছুটতে ছুটতে আমরা হয়রান হয়ে যাই কিন্তু থামি না। থামার জন্য দেহ-মন যদিও কভু চায়, অতি লোভের বহ্নি জ্বালাতে জ্বালাতে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। চলতে চলতে বহুদূর চলে যাই, লাভের বাহুল্য লোভে সর্পিল রাস্তাটার বাঁকগুলোও দেখতে পাই না। এক সময় রাস্তাটা হারিয়ে ফেলি, তবুও অজনা গন্তব্যে ছুটতে থাকি। শেষমেষ কিছুই পাই না। পরিণামে সুখের ঘরে আগুন জ্বলে। সুখ হারিয়ে যায় নিরুদ্দেশের পথে। বিপন্ন আমি পড়ে থাকি সর্বহারার কাতারে। একূল ওকূল সবকূলই ভেঙে যায়। শুধু পড়ে থাকে অনেক দূরের ধু ধু বালুচর।

যাদের জন্য অতি লোভের ঘরে বসবাস, তারা আমাকে দেখে না। আগুনের লেলিহান শিখা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় অনেক দূর। তারা বেঁচে যায়, আমি জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে পড়ে থাকি একা। আমার একালও যায়, ওকালও যায়, শুধু অপেক্ষা করে ওকালের শেষপ্রান্তের অগ্নিশিখা। সৃষ্টিকর্তার সাবধান বাণীকে অতি লাভের লাভায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লুকিয়ে পড়ি লাভের আঁচলে। অতি লোভ আমাকে টেনে নিয়ে যায় কোন সুদূরে, জানি না কোনো কালেই। তবুও ছুটি, ছুটতে থাকি অনবরত সুখের সন্ধানে। অতি লাভ, অতি লোভ, আর সুখের পেছনে ঘাপটি মেরে থাকা অ-সুখ তাড়াতে থাকে আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না হারাতে পারে আমাকে। চলতে চলতে হারাই নিজেকে। হারিয়ে যায় আপনজনেরা। বিপদে-সংকটে গান গায় না কোনো আপনজন আমার তরে। আমি নিঃস্ব হয়ে পড়ে থাকি হারিয়ে যাওয়া মরুতে।

আমরা আধুনিক আর সেজন্যই কি আমরা অতি লোভী? নাকি আমরা অতি লোভী আর সেজন্যই আধুনিক? চারদিকে এত কিছু বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে অতি লোভের বীজ। আবার অত বেশি পরিমাণে কিছু নেই যা আমাদের নৈতিক শক্তিকে করতে পারে উদ্বুদ্ধ। ‘যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি চাই’, এরূপ অনুভূতিই আমাদেরকে ঠেলে দেয় অতি লোভের দিকে। আর এভাবেই সবাই যখন আশ্রয় নেয় অতি লোভের চাদরের তলায়, তখন অতি লোভ ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্সারের মতো সমাজের সারা দেহে; সবাইকে গিলে ফেলে, কাউকে ছাড়ে না মেদিনীর যেখানেই যাক না কেন। অতি লোভ বসবাস করে ব্যক্তিতে, পরিবারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, সরকারি সংস্থায়, বেসরকারি অঙ্গনে, শেয়ার বাজারে, ফটকা ব্যবসায়ে, জুয়ার আসরে, হাউজি খেলায়, ক্লাবের নাচঘরে, ঘোড়দৌড়ের বাজিতে, এমনকি তাসের আড্ডায়। আমাদের নফ্স, আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় অতি লোভ-লালসায় হাহাকার করে হূদয়ের অন্তস্থলে, ঘাপটি মেরে বসে থাকে দেহ-খাঁচার ভেতরে।    

শুধু এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে না অতি লোভ নামক চঞ্চল পাখিটা। থাকে সর্বত্র, ঘুরতে থাকে সর্বত্র। এ পাখির নখরে থাকা প্যারাসাইটগুলো আক্রমণ করে শিক্ষককে, গবেষককে, আমলাকে, প্রশাসককে, বিশ্বাসের বেদিতে আসীন থাকা জনমানুষের প্রতিনিধিকে, উঁচুতলার মানুষকে, মধ্যমতলার অনেককে। একই অঙ্গে অনেক রূপ নিয়ে অতি লোভ দেখা দেয় ঘুষের আকারে, চাঁদা আর মুক্তিপণের অবয়বে, ভেজালের ছদ্মাবরণে, খাদ্যে কেমিক্যাল-বিষের রূপে, যৌতুকের মোহাবরণে, ডোনেশনের ভদ্রাবরণে এবং আরও বহু রকমের ছলাকলায়। যে ঘুষ খায়, সে তা খায় অতি লোভের কারণে। যে ঘুষ দেয়, সে-ও তা দেয় অতি লোভের কারণে—কিছু দেবে আর কিছু নেবে আর দুপক্ষেরই কিছু-না-কিছু ‘মিলিবে’। অতি লোভের কারণেই মানুষ হয় নদীখেকো, পাথরখেকো, বালুখেকো, পাহাড়খেকো, আর হয় ভূমিদস্যু, বনদস্যু, জলদস্যু। অতি লোভ মানুষকে করে তোলে রংবাজ, মাস্তান, ছিনতাইকারী, মলমকারী, হেঁচকাটানা সম্পদ-হরণকারী, অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী আর ঘৃণিত লম্পট ধর্ষণকারী।  

অবিশ্বাস্য অনেক কিছু ঘটে অতি লোভের জগতে যা কখনও কখনও অভাবনীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী বন্ধুবর ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ-এর একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, দুই জন ঘুষখোর গবেষক চিনি কোম্পানি থেকে ঘুষ নিয়ে গবেষণার আসল বিষয়বস্তু গোপন রেখে জানিয়েছিলেন যে, চিনি মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতি করে না। অথচ গবেষণার ফলাফল ছিল এ রকম: চিনি শরীরে প্রবেশের পরপরই ক্যান্সারের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে এবং চিনিকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে ক্যানসারের কোষ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ঙ্কর এ বিষয়টি বেমালুম চেপে গিয়ে গবেষক দু’জন চিনির গুণগান গাইলেন শুধু অর্থের লোভে। হায়রে লোভ! কাকে কখন কীভাবে ধরে বোঝার জো নেই। অনেক গবেষক-ডাক্তারের লোভের ফল ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রোগীর মৃত্যু। ড. আহমদ অন্য একটি প্রবন্ধে (যুগান্তর: ২১ অক্টোবর ২০১৮) বলেছেন যে ওষুধ গ্রহণ করে ‘যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দু’লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করলে বুঝতে হবে... এক্ষেত্রে দুর্নীতি কাজ করছে। ... (মূল কারণ) ওষুধের কার্যকারিতা, ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়ার ওপর প্রকৃত গবেষণা চালালে খুব সীমিতসংখ্যক ওষুধ বাজারে আসার ছাড়পত্র পাবে।’ লোভ কীভাবে উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীকেও কাবু করে ফেলে! যদি লোভ বাসা বাঁধে শক্তভাবে সবার অন্তরে, জংলি হায়েনার নখর গেঁথে যায় আমাদের লোভের বুকে, তাহলে কীভাবে বাঁচব আমরা নিজেরা, বাঁচবে কীভাবে আমাদের সমাজটা? বাঁচবে কীভাবে মানবজাতি?

বিশ্বে যত দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে, দেশে দেশে, সব কটাই সংঘটিত করেছিল অনিবারণীয় অতি লোভের মানুষেরা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা ভুলেনি এখনও এদেশের মানুষ। ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয় কীভাবে কিছু অতি লোভী মহাজন খাদ্য গুদামজাত করে, বাজারে না ছেড়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল যার ফলে হাজার হাজার মানুষ মরে রাস্তাঘাটে লাশ হয়ে পড়েছিল শিয়াল কুকুরের মতো, অজানা সংখ্যক অসহায় মহিলা আব্রু বিক্রি করেছিল শুধু জীবনটাকে ধরে রাখার জন্য, কোলের শিশুটার মুখে একমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য। অতি লোভ কখনও সাফল্য দেয় না, বরং ডেকে আনে ধ্বংস। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাপী যে ভয়ঙ্কর আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল তার মূলে ছিল মানুষেরই অতৃপ্ত লোভ। নিজেদের অতি লাভের জন্য ফিনান্সিয়াল ম্যানেজাররা স্পেকুলেশনের উপর নির্ভর করতে গিয়ে সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছিল। অতি লোভ একজন মানুষকে পার্থিব জিনিস পাওয়ার জন্য অতি-উত্সাহী করে তোলে। অতি লোভীরা অন্যের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং বেশি করে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য দিশেহারা হয়ে যায়। তারা তাদের ভুল থেকেও কিছু শেখে না, শিখতে পারে না। অতি লোভীরা মস্তিষ্ক থেকে আসা সতর্ক সঙ্কেতকে উপেক্ষা করে, ফলে তারা বেশি করে ঝুঁকি নেয় বেশি কিছু পাওয়ার লক্ষ্যে। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে বিখ্যাত এনরন কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায় মাত্র দু’জন অতিলোভী কর্মকর্তার কারণে। তারা বেশি করে অতি লাভের আশায় এমন কিছু কাণ্ড করেছিল যা প্রতারণার সামিল। এদের দু’জনের অতি লোভের কারণে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পুঁজি হারায় আর বিশ হাজার কর্মী চাকরি হারায়। তাদের একজন বিচার চলাকালে মারা যায়, আরেক জন এখনও জেলের ঘানি টানছেন। তাদের অবিমৃষ্যকারিতার জন্য বহু লোকের জীবনে ধ্বংস নেমে আসে অথচ তাদের মধ্যে কোনো বিকার ছিল না, ছিল না কোনো মনস্তাপ। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অতি লোভ মানুষের আত্মার ওপর মলিনতা ছিটিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতি লোভীদের সঙ্গে যাদের নিত্য সাহচর্য তারাও এক সময় অতি লোভী বনে যায়; আর যারা ইতোমধ্যে অতি লোভী হয়ে গিয়েছে তারা আরো বেশি করে লোভের কাদায় ডুবে যায়। অতি লোভ থেকে শুরু জীবনের পথে ধাক্কা খাওয়া আর ধাক্কা থেকে পতন অনিবার্য।       

n লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়