মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ কৃষকের ভূমি শৃঙ্খলা। কৃষক বা প্রজার ভূমিতে শৃঙ্খলা না থাকায় ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। মামলা-হামলা, সহিংসতা বেড়েছে। প্রান্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা এখন এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে, ভূমির দাগ-খতিয়ান-মানচিত্র অনুযায়ী এক ছটাক সম্পত্তিও সঠিকভাবে পরিমাপ করার সুযোগ নেই। সম্পত্তি ভাগ-বণ্টন বা কোনো কারণে সম্পত্তি পরিমাপ করার প্রয়োজন হলে দখল সীমানা ধরেই পরিমাপ করতে হয়। আর এ কারণেই অমীমাংসিত সীমানা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে সহিংসতা, মামলা-হামলা এবং সামাজিক অশান্তির যত কারণ। কৃষকের ভূমি নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সামাজিক শান্তি-সমপ্রীতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এজন্য সরকারের তেমন কোনো বাজেট প্রয়োজন হবে না, সরকারের নির্দেশনাই যথেষ্ট। ভূমি নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও সরকারি নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা হলেই কৃষকের ভূমি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। রাষ্ট্রীয় আইন বা মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্র দ্বারা প্রান্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ভূমি প্রশাসনে যে পরিবর্তন ঘটাতে পারে, একজন নাগরিক বা কোনো প্রজা দেশের প্রচলিত আইন দিয়ে জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করেও তা সম্ভব নয়।
স্বাধীনতার চার যুগ পার করছে বাংলাদেশ। পাক আমলের অনেক কালিমা মুছে গেলেও প্রজার ভূমি স্বত্বের নিশ্চিত মালিকানা এবং দক্ষ ভূমি প্রশাসনব্যবস্থা আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রজার ভূমিস্বত্ব নিয়ে পদে পদে ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আবাদকারী কৃষকের শোষণের নিয়ম আজ আর চলার নয়, ভূমি প্রশাসনে পরিবর্তন চায় দেশের প্রজাসাধারণ ও প্রান্তিক কৃষক। সরকারের বলিষ্ট নেতৃত্বে ভূমি প্রশাসনে সাবেক রেকর্ড-অব-রাইট অনুসরণ করে ভূমিনীতি কার্যকর হলে ভূমি প্রশাসনে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
পাক সরকারের জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর প্রজাসাধারণের মধ্যে ভূমি অধিকার নিয়ে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ ও রেকর্ড সংশোধনী কার্যক্রম পরিচালনা করে; যা এসএস রেকর্ড নামে পরিচিত। সংক্ষিপ্ত এই জরিপে সাবেক রেকর্ড-অব-রাইট অনুসরণ না করে দখল স্বত্বের ওপর ভিত্তি করে রেকর্ড সংশোধন করা হয়। ফলে বহুসংখ্যক প্রজা জমিজমা হারিয়ে পথে বসেছে। ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে কৃষকের এমন আত্মঘাতী ঘটনা ঘটত না। সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা স্থির না করে সাময়িক দলিল দস্তাবেজের ওপর ভিত্তি করে রেকর্ড সংশোধন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ ভূমি প্রশাসনে সেই বেআইনি ব্যবস্থা আইনের আদলে লালিত হচ্ছে, যা অবসান হওয়া প্রয়োজন। এসএ রেকর্ড আজ হাজারো কৃষকের বিষফোঁড়া। কৃষক নিরুপায় হয়ে স্বত্ব উদ্ধারে মামলায় জর্জরিত হয়ে অর্থনৈতিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এ বিষয়ে ভূমি প্রশাসন নিশ্চুপ। কৃষকের ঘাম ঝরা শ্রম দিয়ে ফসল উত্পাদন করে। যা দিয়ে অন্য সকলের উদরপূর্তি হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাগত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে তারা নির্বাচনী ইশতেহার বা জনপ্রতিশ্রুতি দেবে। দক্ষিণ বঙ্গের প্রান্তিক কৃষক ও জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দের প্রতি নিবেদন, ভূমি নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও সরকারি নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা হলেই কৃষকের ভূমি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর তাই এসএ জরিপ সংশোধন করার লক্ষ্যে বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে শামিল হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
বাগেরহাট
