হারিয়ে যাচ্ছে নবান্ন উত্সব

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫৩

চিরাচরিত রীতি ও প্রথা অনুযায়ী আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার নবান্ন উত্সব হতো এবং পুরো অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে তা চলত। গ্রামবাসী খুব ধুমধামের সঙ্গে নবান্ন উত্সব পালন করতেন। কৃষকের ঘরে তখন খুশির আমেজ বইত—নতুন ধান্যে হবে নবান্ন। এ উপলক্ষে গাঁয়ের বধূরা গুড়, নারকেল, কলা, দুধ প্রভৃতির সঙ্গে নতুন আতপ চাল মিশিয়ে ক্ষীর রাঁধতেন।

কৃষকদের প্রধান ফসল আমন ধান ঘরে তোলার উত্সব হলো নবান্ন। অতীতে নবান্ন ছিল গ্রামবাংলার কৃষক সমপ্রদায়ের অন্যতম প্রধান পার্বণ। প্রতিবেশী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষীর আদান প্রদান চলত। নবান্ন উপলক্ষে খেলাধুলা ও গানবাজনার আসর জমত। নবান্নের আগে গ্রামীণ মহিলারা বাড়ির উঠানে আলপনা আঁকতেন, ঘরদোর লেপা দিতেন। আগে নবান্নের দিন সকালে কৃষকরা গোসল করে জমিতে ধান কাটতে যেতেন। নবান্নের ধান মাড়াই করার স্থানে লেপা দেওয়ার পর কাঠের পিঁড়ি বা তক্তা বসানো হতো। পিঁড়ির সামনে এঁড়ে গরুর সামান্য গোবর, কিছু সরিষাদানা ও নড়া রেখে সালাম-সিজদা করে ধান মাড়াই করতেন। এ ধানকে খুব সতর্কতার সঙ্গে মাড়াই করে ঝাড়া হতো। ধানকাটা, মাড়া, সেদ্ধ করা, শুকানো সব কাজ একদিনেই সম্পন্ন করার নিয়ম ছিল। নবান্নের ধান এক রোদে শুকাতে হয়, বাসি করা যায় না। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি ক্ষীর খাওয়ার মজাটাই ছিল আলাদা। নবান্ন উত্সবের দিনে পল্লিবধূরা শীতের কাপড়-চোপড় (কাঁথা, কম্বল, সোয়েটার, চাদর প্রভৃতি) মাটির তৈরি কুঠি থেকে বের করতেন। নবান্নের আগে যতই শীত পড়ুক না কেন গ্রামবাসী শীতের কাপড় বের করতেন না।

ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে নবান্ন উত্সব হতো। অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার গ্রামবাসী মসজিদে ক্ষীর দিতেন। জুম্মার নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের ক্ষীর বিতরণ করতে করতে বিকেল হয়ে যেত। রাতে কবিগানের আসর বসত। তখন কৃষকদের প্রধান খাদ্যশস্য ছিল আমন ধান। বর্তমানে আমনের জায়গা দখল করেছে ইরি-বোরো ধান। উচ্চফলনশীল জাতের হাইব্রিড ধানের আগ্রাসনের কারণে নবান্ন উত্সব হারিয়ে যাচ্ছে। দিনাজপুর সদরের পল্লিবধূ রাবেয়া বেগমের দেওয়া তথ্য মতে, নবান্নের  দিনে নয় রকম খাবার খেতে হয় বলে এর নাম নবান্ন। গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে ৯ পদের খাবার রান্না করা হতো। এগুলো হলো—ক্ষীর, ছোলা-মুড়ি, মাশকলাইর ডাল (ভাতের সঙ্গে), আমিলা (চালকুমড়ার সঙ্গে গুড় ও তেঁতুলের টকসহযোগে প্রস্তুত ব্যঞ্জন বিশেষ), মটরশাক-সরিষাশাক, তিন চাউলি (চালের খুদ ভিজিয়ে দুধ কলা চিনি দিয়ে প্রস্তুত মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্য), মাংস, মাছ এবং মূলা-বেগুন-শিম প্রভৃতি শীতকালীন শাকসবজি। নবান্ন উপলক্ষে গ্রামের মহিলারা  নতুন জামাকাপড় পরতেন এবং বিভিন্ন ধরনের অলংকার দিয়ে সাজগোজ করতেন।

নবান্ন শ্রেণিহীন এক অসামপ্রদায়িক উত্সব। নবান্ন উত্সব বাঙালি জাতিকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে। নবান্নের পরশে মানুষ সংস্কৃতিবান হয়। নবান্ন উত্সব বাঙালির জনজীবনে অনাবিল আনন্দ, সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক— এ প্রত্যাশা সবার।

দিনাজপুর