ফের সাময়িক বরখাস্ত মেয়র আরিফুল, বুলবুল ও গউস

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৭, ২৩:৫৮

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল রবিবার অফিস করতে গিয়ে আবারও সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ পেলেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ এই নোটিশ পাঠায়। ইতিপূর্বে এই বিভাগের জারি করা  সাময়িক বরখাস্তের আদেশ উচ্চ আদালত বাতিল করে দেওয়ায় তারা গতকালই প্রথম অফিসে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। যোগও দিয়েছিলেন। উত্সব আনন্দে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ পান তারা। আরিফুল হক সুনসান নীরবতায় বেরিয়ে যান। আর বুলবুল বললেন, সরকারের আদেশ অবৈধ। আজ সোমবার আবার অফিস করার ঘোষণা দেন তিনি।

দায়িত্ব গ্রহনের পর্বে রাজশাহীতে বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল। ভেতরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। উত্তেজনাও ছিল বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এ নিয়ে তারা দুজনই দ্বিতীয়বারের মতো সাময়িক বরখাস্তের আদেশ পান।

এ ছাড়া আদালতের নির্দেশে ১০ দিন আগে দায়িত্ব ফিরে পাওয়া হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউসকেও গতকাল সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে প্রথম দফায় সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আর একই বছরের ৭ মে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সংক্ষুব্ধদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সেই বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে দেয়।

আরিফুল হকের গতকালের বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্র গত ২২ মার্চ সুনামগঞ্জের বিশেষ আদালত গ্রহণ করায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হল। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে।

অপরদিকে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বরখাস্তের আদেশে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর মহানগর বিশেষ আদালত-১  একটি ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে। তাই তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার আসামি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হককে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের একটি আদালত কারাগারে পাঠায়। গত ৪ জানুযারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাময়িক বরখাস্ত আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আরিফুল হক। আবেদনের শুনানি শেষে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ গত ১২ মার্চ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। পরে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন।

নাশকতার অভিযোগের চার মামলায় পুলিশ বুলবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০১৫ সালের ৭ মে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বরখাস্তের ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বুলবুল। হাইকোর্ট ওই বছরের ২৮ মে বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করে রুল জারি করে। শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশ অবৈধ বলে রায় দেয়।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে ২০১৬ সালের ৪ জুন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে এবং রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেয়। এই আবেদনের ওপর গত ৫ মার্চ শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ।

এদিকে হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছকে বরখাস্ত করার কারণ হিসাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের ওপর হামলা মামলায় মেয়র জি কে গউছ চার্জশিটভুক্ত আসামি। হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।  তিনি জানান, রবিবার দুপুরে এ সংক্রান্ত একটি আদেশ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর গত ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেল থেকে নির্বাচিত পৌর মেয়র জি কে গউছ।

গত ৪ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান জি কে গউস। এরপর ২৩ মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন হবিগঞ্জ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র দিলীপ দাশ।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস  কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন। এ ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এমপি আবদুল মজিদ খান বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন।

২০১৪ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় সর্বশেষ সম্পূরক চার্জশিটে জিকে গউছকে আসামিভুক্ত করা হয়। ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর  ?তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এসব মামলায় কারাগারে থেকেই পৌর নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। ভোটে বিজয়ী হন গউছ। প্যারোলে মুক্ত হয়ে শপথ গ্রহণ করেন। ফৌজদারী মামলায় কারাগারে আটক থাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। এ ছাড়াও ২০০৪ সালের ২১ জুন দিরাই বাজারে সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের একটি সমাবেশে বোমা হামলার মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

১২ মিনিট অফিসে বসে বেরিয়ে গেলেন বুলবুল

রাজশাহী থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, দীর্ঘ ২৩ মাস দায়িত্বহীন থাকার পর বিপুল সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থক নিয়ে মেয়র বুলবুল গতকাল সকাল ১০টায় নগর ভবনে যান। কিন্তু মেয়রের অফিস তালাবদ্ধ থাকায় তিনি প্রথমে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে এবং পরে রাসিকের সচিবের অফিস কক্ষে গিয়ে বসেন। এ সময় রাসিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেয়র ও বিএনপিপন্থী কাউন্সিলররা কথা বলেন। বিএনপির কাউন্সিলরা রাসিকের কর্মকর্তাদের তালা খুলতে বললে তারা অপরগতা জানান। এনিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বিএনপি সমর্থক কাউন্সিলর ও নেতাকর্মীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়রের একান্ত সচিব ও এপিসের কক্ষের চেয়ার ও থাইগ্লাস ভাংচুর করে। পরে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়। দুপুর ২টার পর রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন ও সচিব মাহাবুবুর রহমান পুলিশের সহযোগিতায় মেয়রের কক্ষের তালা দুটি ভাঙেন। এরপর ওই অফিস কক্ষের জিনিসপত্রের তালিকা প্রণয়ন শেষে বিকেল ৩টার দিকে মেয়র বুলবুল তাঁর নির্ধারিত অফিসে গিয়ে বসেন। বিকেল ৩টা ৫ মিনিটের দিকেই রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ফ্যাক্সে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তার সাময়িক বরখাস্তের নতুন আদেশ আসে।

নতুন বরখাস্তের আদেশের খবর শুনে বিকেল ৩টা ১২ মিনিটের দিকে তিনি নগরভবন থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, যে কারণ দেখিয়ে তাকে আবারও বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়েছে, সে কারণে আগেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের আদেশে তিনি দায়িত্ব ফিরে পেয়েছেন। তাই মন্ত্রণালয়ের নতুন আদেশ তিনি আমলে নিচ্ছেন না এবং আজ সোমবার তিনি অফিস করবেন বলে জানান।

এদিকে মেয়র বুলবুলের দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই নগর ভবনে উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আর্মড পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে নগর ভবনে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম-উল-আযীমকে দেখা যায়নি।

তিন ঘন্টা অফিসে ছিলেন মেয়র আরিফুল

সিলেট অফিস জানায়, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় এলাকাবাসী ও অনুসারীদের নিয়ে বাসা থেকে হেঁটে সোয়া ১১টার দিকে নগর ভবনে পৌঁছান সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরিফকে ফুলেল অভর্থ্যনা জানান। বেলা ২টার দিকে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ এসে পৌঁছায়। এর কিছুক্ষণ পরই অফিস ত্যাগ করেন তিনি।

২০১৩ সালের ১৫ জুন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী হন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। নির্বাচনের দেড় বছরের মাথায় তিনি জড়িয়ে পড়েন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সিআইডির সমপূরক চার্জশিটে ওই মামলায় আসামি হন তিনি।

ইত্তেফাক/নূহু