কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বাড়িঘর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩০

আকস্মিক বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকা। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ফসল, ঘরবাড়ি ও গাছপালার। ঝড়ের সময় নৌকাডুবি ও বজ পাতের ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ৫ জন এবং পাবনার সাঁথিয়ায় বজ পাতে দুই শিশু, সিরাজগঞ্জের এনায়েত-পুরে এক কৃষক ও যশোরের ঝিকরগাছায় ছাদ ধসে এক শিশু মারা গেছে। এ বিষয়ে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা): ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার খোলামুড় এলাকা থেকে রবিবার সন্ধ্যায় ৬ বন্ধু নৌকাযোগে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কামরাঙ্গীরচর যাওয়ার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় ৪ বন্ধু সাঁতরে উপরে উঠলেও এবং সাব্বির ও তুহিন নামের দুইজন নিখোঁজ থাকে। পরে স্থানীয় লোকজন ও ডুবরিরা রাত সাড়ে ৮টায় নিখোঁজ দুইজনের মৃতদেহ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করে। অপরদিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার বরিশুর এলাকায় রুমি আক্তার ও তার তিন বছরের শিশু পুত্র আলী হোসেন বুড়িগঙ্গায় ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ থাকার পর রাতে মা ও ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সোমবার সকালে উদ্ধারকৃত ৪টি লাশের ময়না তদন্তের জন্য মিটফোর্ড মর্গে পাঠায়। এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় পৃথক দুটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

কালবৈশাখী ঝড়ে বাবুবাজার ব্রিজের লাইট পোস্ট পড়ে আহত দিনমজুর গতকাল দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতালে মারা গেছে।  রবিরার সন্ধ্যায় কাজ শেষে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার শুভাঢ্যা উত্তরপাড়া বাসায় ফেরার পথে বাবুবাজার ব্রিজে পৌঁছলে ঝড়ে ব্রিজের লাইট পোস্ট ভেঙে পড়ে আলমগীর হোসনে (৪০) আহত হন। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিত্সারত অবস্থায় সোমবার দুপুরে সে মারা যায়।

সাঁথিয়া (পাবনা) : পাবনার সাঁথিয়ায় মাঠে পেঁয়াজ কুড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে শাকিল হোসেন (৯) ও রঞ্জিতা (৮) নামে দুই শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। শাকিল উপজেলার পাথাইলহাট গ্রামের দিন মজুর শাহিন হোসেনের ছেলে ও রঞ্জিতা একই গ্রামের দিন মজুর আবুল কালামের মেয়ে। জানা যায়, রবিবার বিকালে শাকিল ও রঞ্জিতা গ্রামের মাঠে পেঁয়াজ কুড়াতে গেলে হঠাত্ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই দুই শিশুর করুণ মৃত্যু হয়।

এদিকে আমাইকোলা গ্রামের মানিক বাবুর নৌকা নারায়ণগঞ্জ থেকে পাথর বোঝাই করে বেড়া আসছিল। রাজবাড়ীর দৌলতপুরের ধুলসুরায়া এলাকায় প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাটি পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। এ ঘটনায় তিনজন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। তারা হলো উপজেলার আমাইকোলা গ্রামের নাসির, ইসমাইল এবং অপর নিখোঁজ          শ্রমিকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ): সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ধুলিয়াবাড়ি চরে বজ্রপাতে এক বৃদ্ধ কৃষকের মৃত্যু এবং তার স্ত্রী আহত হয়েছে। নিহত রমজান আলী সরকার বেতিল চরের মৃত রাহাজ উদ্দিন সরকারের ছেলে। তার স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। এদিকে নিহত কৃষকের গোয়াল ঘরে থাকা ৪টি গরু ও ১টি ছাগলও বজ্রপাতের আঘাতে একই সাথে মৃত্যু হয়।

ঝিকরগাছা (যশোর): রবিবার গভীর রাতে উপজেলার শিমুলিয়া, বেনেয়ালী, রাজাপুর, পুরন্দপুর, সরষকাঠিসহ বিভিন্ন গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছ পালা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ঝড়ের সময় পুরন্দপুর গ্রামে সিঁড়ি ঘরের ছাদ ধসে মেহেদী হাসান অমি নামে ১৪ মাসের এক শিশু নিহত ও আরো ১৪ জন গুরুতর আহত হয়। মিম (২৫) ও মমতাজ বেগম (৪৫) এর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ধুনট (বগুড়া): উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে বাড়িঘরসহ উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যার দিকে প্রথম দফায় দমকা বাতাস ও শিলাবৃষ্টিতে বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ সময় অসংখ্য গাছপালা ভেঙে পড়ে। মধ্যরাতের দিকে দ্বিতীয় দফায় কালবৈশাখী ঝড়ে বেশ কিছু বাড়িঘর ভেঙে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এতে উপজেলার ভাণ্ডারবাড়ি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে এক হাজার পরিবারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার): আগাম কালবৈশাখী ঝড়ে কমলগঞ্জে উপজেলাসহ রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার একাংশ বিদ্যুিবহীন হয়ে পড়ে। ঝড়ে বাড়িঘর বিধ্বস্তের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিদ্যুত্ সঞ্চালন ব্যবস্থা। রবিবার সকাল থেকে গতকাল সোমবার বেলা ২টা পর্যন্ত কমলগঞ্জ উপজেলা বিদ্যুিবহীন হয়ে পড়ে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।

চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম): গত রবিবার সন্ধ্যায় কাল বৈশাখীর ঝড়ো হাওয়ায় চন্দনাই্শ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গাছপালা পড়ে বিদ্যুত্ সংযোগ লাইন বিছিন্ন হয়ে পড়ে। ঝড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং বিভিন্ন স্থানে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যায়। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সোমবার বিকাল পর্যন্ত বিদ্যুত্ বিছিন্ন থাকে।  এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা সংযোগ লাইনে কাজ করছিলেন বলে জানা যায়।

মহালছড়ি (খাগড়াছড়ি): রবিবার রাতে মহালছড়ি উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুত্ বিপর্যস্ত, ফসল, ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছপালা উপড়ে ও ডালপালা ভেঙে মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি সড়কের ওপর পড়ে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। মহালছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে তছনছ হয়ে যায়। এ ছাড়া কাটিংটিলা, মনাটেক, সিঙ্গিনালা, মহালছড়ি সদর, টিলাপাড়া, থলিপাড়াসহ অনেক গ্রামের ঘরবাড়ির টিনের চালা উড়ে গেছে। অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে ও খুঁটি ভেঙে সারারাত বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন ছিল মহালছড়ি উপজেলাবাসী জানান।

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা): রবিবার দামুড়হুদা এলাকায় ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে থোড় ধান, ভুট্টা ও আম মুকুলের বেশ ক্ষতি হয়েছে বলে চাষিরা জানান। এলাকাবাসী জানান, হঠাত্ শুরু হওয়া শিলা বৃষ্টিতে থোড় ধান, ভুট্টাক্ষেত এবং আমের মুকুলের বেশ ক্ষতি হয়। সাথে কলা, পেঁপে ও পান বরজ লণ্ডভণ্ড হয়।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ): ঝড়ের কবলে পড়ে শিবালয় উপজেলার দুই কৃষি শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। শিবালয় ইউএনও মেহেদী হাসান জানান, রবিবার বিকালে ঝড়ের কবলে পড়া তিন কৃষি শ্রমিকের মধ্যে একজন ফিরে আসলেও অপর দুজন এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ধুতরাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ইয়াদ আলী (৫০) ও ঝঁড়িয়ারবাগ গ্রামের বাসিন্দা চাঁন মিয়ার (৪৮) খোঁজ মেলেনি। রবিবার বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে পশ্চিম-উত্তর কোণ থেকে উঠে আসা প্রবল ঝড়ে এলাকার কয়েকশ কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা, উঠতি ফসল বিশেষ করে ইটভাটা ও বিলবোর্ড-সাইনবোর্ডের দারুণ ক্ষতি সাধিত হয়। গাছপালা ভেঙে ও ঘরের চালা উড়ে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়। 

লাকসাম (কুমিল্লা): কালবৈশাখী ঝড়ে লাকসামে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকায় তিন উপজেলার আড়াই লাখ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়ে। এছাড়াও  ঝড়ে গাছ উপড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্যাসের পাইপলাইন। ঝড়ে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাসাসহ শিল্প-কারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা নেমে আসে। পিডিবি’র প্রায় ২৮ হাজার ও পল্লি বিদ্যুতের লাকসাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ উপজেলার সোয়া দুই লাখ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়ে।