ছোট্ট নাতনিকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন আবু বকর

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ০১:২৪

‘২৯ মার্চ রাত ১টার দিকে একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন কল আসে। কল রিসিভ করার পরেই যে কণ্ঠটি ভেসে আসে সেটা আমার বড় নাতনি আমেনা খাতুনের। তাকে লোকমান আলী ২ মাস আগে বগুড়ায় বিয়ে দিয়েছে। তাকে এখনো বিদায় করা হয়নি। ফোনে নাতনি দু-একটি কথা বলার পরই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এরপর সে ফোনটি তার মা সিরিনা আক্তারের হাতে দেয়। সিরিনা দৃঢ় কণ্ঠে প্রায় ৩০ মিনিট কথা বলে। সে বলে বাবা আপনারা আমাদের ক্ষমা করবেন। আমাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। আমি বারবার বলি তুমি কোথায় আছ ঠিকানা বল, আমি সেখান থেকেই নিয়ে আসব। সিরিনা তখন বলে আমাদের যাবার কোনো উপায় নেই। তখন সিরিনার পাশেই ছিল তার জামাই লোকমান আলী।’ এভাবেই মৌলভীবাজারের নাজিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় নিহত মেয়ে ও নাতনিদের সঙ্গে শেষ আলাপের কথা বলছিলেন আবু বকর সিদ্দিক।

আবু বকর বলেন, ‘৫ নাতনির মধ্যে সবচেয়ে ছোট্ট নাতনিকে আমার কাছে রাখার জন্য কাকুতি মিনতি করেছি। কিন্তু পাষণ্ড জঙ্গি লোকমান তাকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত ওই ছোট্ট মেয়েটিকেও ওরা মেরে ফেলল।’ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এসব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ওরা যে এই পথে গেছে সেটা বুঝতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। যখন বুঝেছি তখন আর কিছুই করার ছিল না।’

মৌলভীবাজারে জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৭ জন ঘোড়াঘাট উপজেলার ডাঙ্গা গ্রামের লোকমান আলী ও তার স্ত্রীসহ ৫ সন্তান। লোকমান ও স্ত্রী সিরিনা আক্তারের একটি ছবি ডাঙ্গা গ্রামের লোকমানের তার সত্ মা ও বোনকে দেখালে ছবিটি তাদের বলে নিশ্চিত করেছেন তারা। নিহত জামাই, মেয়ে, ৫ নাতনিদের মরদেহ ফিরে পেতে চায় লোকমান আলীর শ্বশুর একই উপজেলার কলাবাড়ী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক ও তার স্বজনরা। গত ৩০ মার্চ বৃহস্পতিবার জঙ্গি আস্তানায় ৭ জঙ্গি আত্মহননকারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

আত্মহননকারীরা হলো, লোকমান হোসেন (৩৬), তার স্ত্রী সিরিনা আক্তার (২৭), বড় কন্যা আমেনা খাতুন (১২),  সুমাইয়া (৯), মরিয়ম (৩), ফাতেমা (৫) ও খাতিজা (৬ মাস)। উপজেলার কলাবাড়ী গ্রামের লোকমান আলীর শ্বশুর আবু বকর সিদ্দিকের বাড়িতে গেলে পরিবারের সকল লোকজনকে মুহ্যমান অবস্থায় দেখা যায়। সিরিনা আক্তারের মা জোবায়দা বেগম জানান, ২০০২ সালে পার্শ্ববর্তী ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের (বাউয়া) ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ে দেওয়ার পর কয়েক বছর তাদের সংসার ভালোই চলছিল। ২০০৮ সালের মধ্যে বড় ২ মেয়ে আমেনা ও  সুমাইয়া জন্মগ্রহণ করার পর সে ও তার পরিবার বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের জামাই বিভিন্ন উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত আছে। তবে সরাসরি জঙ্গি তত্পরতায় সংশ্লিষ্ট ছিল এটা তারা জানতেন না। এজন্য জোবায়দা বেগম তার মেয়ে সিরিনা আক্তারকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। পরে নিজ বাড়ি কলাবাড়িতে প্রায় ৪ মাস থাকার পর সিরিনা আক্তারকে তার জামাই এসে নিজে এসব কর্মকাণ্ড জড়িত না থেকে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করে ভালোভাবে ঘরসংসার করবেন বলে ফেরত নিয়ে যায়।

সিরিনা আক্তারের বড় বোন শিউলি আক্তার জানান, তার সঙ্গে বোন জামাই প্রায় ১ বছর গার্মেন্টেসে চাকুরি করে নিজ গ্রাম দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ফিরে এসে প্রায় আরও ২ বছর গ্রামেই সংসার করে। এরপর লোকমান আলী ও তার স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে প্রায় ৫ বছর ধরে নিরুদ্দেশ ছিল। লোকমানের সত্মা সমর্থভান জানান, ৬-৭ বছর থেকে লোকমানের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে লোকমানের বাবা নুরুল ইসলামের খোঁজ নেওয়া হলে লোকমানের বোন জানান, পুলিশের লোকের ভয়ে সে গুরুতর অসুস্থ হয় বলে তাকে অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে। ডাঙ্গা গ্রামের লোকমানের পাশের বাড়ির আব্দুল হামিদ জানান, দীর্ঘদিন থেকে লোকমান গ্রামে আসে না। এ ব্যাপারে স্থানীয় শিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মণ্ডল জানান, লোকমান দীর্ঘদিন থেকে পলাতক থাকায় আমার সন্দেহ হয়েছিল। এজন্য আমি  বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট থানার আগের ওসি মো. নুরুজ্জামান চৌধুরী ও র্যাবের কর্মকর্তাকে তথ্য দেই। তথ্য অনুযায়ী তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

ঘোড়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইসরাফিল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছু জানেন না বলে প্রথমে জানিয়েছিলেন। তবে শনিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত পুলিশ একাধিকবার ডাঙ্গা গ্রামে টহল দিয়েছে বলে জানা গেছে।
ইত্তেফাক/নূহু