ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢলে বহু হাওর ও ফসলি জমি পানির নিচে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ২৩:৫৩

পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সিলেটসহ কয়েকটি জেলায় বহু হাওর ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আরো অনেক হাওর ও ফসলি জমি ডুবে যাবার যোগাড়। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী (সিলেট অফিস) জানান, মধ্য চৈত্রে অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের সাথে প্রতি রাতের শিলাঝড় সিলেট অঞ্চলের কৃষকদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। সিলেটের ফসলী মাঠ ভাসিয়ে এখন নদী-নালা জোয়ারের পানিতে ফুসে উঠছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, এবার হওরের ক্ষতি অকল্পনীয়। অনেক বড় বড় হাওরের কাঁচা ধান ডুবে গেছে। বাকী যেগুলো আছে সেগুলো রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সিলেটের পাথুরে এলাকা জাফলং,জৈন্তা,গোয়াইনঘাটের পাথর কোয়ারি ডুবে গিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক গত কয়েকদিন থেকে বেকার।

সিলেট বিভাগের চার জেলার কাঁচা বোরো ফসলের মাঠ একের পর এক ডুবছে। সুনামগঞ্জ জেলায় বাধ ভেঙ্গে ও বাধ উপচে গিয়ে বেশীর ভাগ ফসলের হাওর ডুবে গেছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তরা জানান। কোন কোন স্থানে বাধের ডিজাইন লেবেলের উপরে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বাধ উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করছে। এবার বেশী পানি নেমেছে সুনামগঞ্জের পাটলাই, যাদুকাটা, চলতি নদী, খাসয়া মারা সহ বিভিন্ন পাহাড়ী নদী ও ছড়া দিয়ে। সেই সাথে যোগ হয়েছে ভারতের বরাক নদীর পানি। কৃষি বিভাগ জানায়, সোমবার বিকাল পর্যন্ত শিলা ও বাধ ভেঙ্গে  সিলেটের চার জেলায় মোট ৭৩ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জেই ৪৩ হাজার ৩১৫ হেক্টরের বোরো ও সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিলেট জেলা। হাওরের পানি যতই বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক ততই বাড়ছে। হাওর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ ঠিকিয়ে রাখতে স্বেচ্ছা শ্রমে বাঁচা-মরার লড়াই চলছে। ঢল, শিলা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সিলেট বিভাগের ২৭ টি উপজেলার হাওরাঞ্চলে  এখন হাহাকার।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার লাখ লাখ বোরো চাষীদের বিলাপে ভারি হয়ে গেছে হাওরের আকাশ বাতাস। চলতি মৌসুমে যে দুই লাখ ৩০  হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল তার প্রায় ৬০ ভাগেরও বেশি ফসল এখন পানির নিচে। বোরো ফসলের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করে গতকাল বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে শান্তিগঞ্জ এলাকায় জনতা বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা হাওরের ফসলরক্ষায় স্থায়ী সমাধান এবং সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান। অবরোধে ভোগান্তিতে পড়েন বিপুলসংখ্যক সাধারণ যাত্রী। রাস্তার দুই পাশে কয়েক কিলোমটির দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, জেলার খাদ্যভান্ডার খ্যাত সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দেখারহাওর, খরচারহাওর, কাংলারহাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার হালিহাওর, দিরাই উপজেলার বরাম হাওর, ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল, ফাসুয়াহাওর, গুরমাহাওর, বোয়ালাহাওর, শালদিঘাহাওর, জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ারহাওরসহ বেশিরভাগ ধানী হাওর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ছাতকের হাওর পাড়ে চলছে ফসলহারা কৃষকদের আহাজারি। ধান পাকার   আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে হাওরের পর হাওর।  পাহাড়ী ঢল ও টানা বর্ষনে এখানের ছোট-বড় ৬৪টি হাওরের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ফসলহারা কৃষকের অভিযোগ, হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মানে দূর্নীতি ও পানিউন্নয়ন বোর্ডের দায়সারা নজরদারীর কারনে অনেক হাওরের ফসল নষ্ট হয়েছে। উপজেলার জল্লার হাওর, ঝাওয়ার হাওর, দেখার হাওর, নাইন্দার হাওর, ডেকার হাওর, চাতলির হাওর, রাঙ্গা-ডিঙ্গা হাওর, চাউলীর হাওর, ফাটার হাওর, ইন্দুরার হাওর, সুরিগাঁও হাওর, ডিমকা, বাড়ুকা, গয়ার, রুকুর হাওরসহ অন্তত ৩০টি হাওরের বোরো ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

ডিমলা  (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উজানের ঢলে তিস্তা নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় থেকে তিস্তার ঢলে নীলফামারী ও লালমনিররহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। উজানের ঢলের কারনে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী মৌজার আশে পাশে কয়েক হেক্টর জমিত ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিস্তা নদীটি টেপাখড়িবাড়ী মৌজার চরখড়িবাড়ী এলাকা নিয়ে নতুন একটি চ্যানেল তৈরি করে। ফলে উক্ত এলাকায় ভুট্টা, বাদাম, মরিচ. পেয়াজ, রোপা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মর্মে টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন নিশ্চিত করেন।  গত দুইদিনে আগে তিস্তা মরুভুমিতে থাকলেও ভারতে উজানে বন্যার কারনে রবিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তা পানি বাড়তে শুরু করার সোমবার সকাল থেকে ৪৪টি সুইচ গেট খুলে দেয়া হয়েছে।

পূর্বধলা (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, পূর্বধলায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর আবাদকৃত বোরো ফসল। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে অতি বৃষ্টিতে উপজেলার আগিয়া, হোগলা, ঘাগড়া, জারিয়া, ধলামূলগাঁও ও বিশকাকুনী ইউনিয়নের  ৪২টি গ্রামের ৭শ’হেক্টর ফসলী জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি আফিসার জানান, একমাত্র সুইচ গেইটটি বন্ধ থাকার কারণে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে না পারায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় মহাস্থান এলাকায় করতোয়া নদীতে বাঁধ দিয়ে নদী খনন করার ফলে ৫০ একর জমির বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে। এতে করে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে।এদিকে গত ক’দিনের প্রবল বৃষ্টিপাতে পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে নিচু এলাকার বোরো ধান, ভুট্টাক্ষেত, মিষ্টি আলু, মুলাসহ প্রায় ৫০ একর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

ইত্তেফাক/নূহু