বয়স পঁচাশি ছুঁলেন তিনি। শরীরে বয়সের ছাপ। আগের মতো দৌড়-ঝাঁপ করে সংগঠনের কাজ করতে পারেন না। সে নিয়ে খেদের অন্ত নেই। তবে মনে এখনো তারুণ্যের প্রাণোচ্ছলতা। তিনি সন্জীদা খাতুন। বাংলাদেশে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত এক নাম। আজ তার পঁচাশিতম জন্মদিন। সন্জীদা খাতুন, আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন!
তবে জন্মদিন নিয়ে তেমন উচ্ছ্বাস নেই তার মাঝে। বলেন, ‘জন্মদিন আমার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। এটা একটা জৈবিক ব্যাপার, এমনই কোনো একদিন জন্মেছিলাম। আরেকটু বুড়ো হয়ে গেলাম এই আর কি! জন্মদিনের চেয়ে এবার আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি।’
আগের মতো ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করতে পারেন না বলে খেদও ঝরলো। বলেন, এই শহরে বসে গান গাইলে হবে না। গ্রামের মানুষের কাছে যেতে হবে। তাদের মতো করে বলতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির কথা।
সন্জীদা খাতুন জীবনে কখনোই টাকার পেছনে ছোটেননি। নিজের কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এভাবে সংগঠনের কাজে নিজের জীবনকে সমর্পণ করে দেয়া, কোনো ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের জন্য এমন সম্পূর্ণরূপে নিবেদন এসময় তেমন দেখা যায় না। ছায়ানটের জন্য কাজ করতে গিয়ে প্রাপ্তির কথাও ভাবেননি। পুরো জীবন মানুষের জন্য সমর্পিত তার। তার সারাজীবনের পথচলা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে রয়েছে। তার চলায়, বলায় — অশিক্ষা, কূপমণ্ডুকতা দূর করে মানুষের মনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাতিঘর জ্বালাতে নিরন্তর সাধনা করে চলেছেন। ছায়ানটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সাংগঠনিক দক্ষতার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টান্ত, পরিণত হয়েছেন প্রতিষ্ঠানতুল্য ব্যক্তিত্বে।
সন্জীদা খাতুন ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। মাতা সাজেদা খাতুন। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স করেন। ১৯৫৫ সালে বিশ্বভারতী থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে তিনি ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ’ গবেষণাপত্রে পিএইচডি লাভ করেন। পরে ১৯৮৩-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত পিএইচডি উত্তর গবেষণা করেন। সন্জীদা খাতুন ১৯৫৭ সালে ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে প্রফেসর হিসেবে অবসরগ্রহণ। দীর্ঘ জীবনে তিনি বাংলাদেশ সরকারের ‘একুশে পদক’, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ‘দেশিকোত্তম’ (ডি. লিট), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ‘রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার’, কলকাতার ‘টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ থেকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি, ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’, ‘অনন্যা’ পুরস্কার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ফেলোশিপ, বেগম জেবুননেছা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা, ‘সা’দত আলী আখন্দ পুরস্কার’, বিজয় দিবস পদক, ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র-পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।
তিনি ১৯৬১ সালে জন্মকাল থেকে ‘ছায়ানট’ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ১৯৭২ সাল থেকে অদ্যাবধি ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন’-এর অধ্যক্ষ। ২০০১ সাল থেকে ‘ছায়ানট’-এর সভাপতি। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ্’ -এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়াও ‘নালন্দা’ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। তার বেশকিছু রবীন্দ্রনাথের এলবাম প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি একজন সফল লেখক। ‘কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ’ ‘ধ্বনি থেকে কবিতা’, ‘অতীত দিনের স্মৃতি’, ‘তোমারি ঝরণাতলার নির্জনে’, ‘রবীন্দ্রনাথ: বিবিধ সন্ধান’, ‘কাজী মোতাহার হোসেন’, ‘রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে’, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই উত্রাই’, ‘ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা’, ‘সংস্কৃতির বৃক্ষছায়ায়’, ‘স্বাধীনতার অভিযাত্রা’, ‘সাহিত্যকথা সংস্কৃতিকথা’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘জননী জন্মভূমি’, ‘রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ: তার আকাশ-ভরা কোলে’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’, ‘রবীন্দ্রনাথের গান মননে লালনে’ সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন।
ইত্তেফাক/নূহু
