অগ্নিকাণ্ড রোধে প্রধানমন্ত্রীর ১৫ নির্দেশনা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩৮

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অগ্নিকাণ্ড রোধ এবং এর ক্ষয়-ক্ষতি এড়াতে বহুতল ভবন মালিকদের জন্য বছরের শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট গ্রহণ, আগুন লাগার পর ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আরো উন্নত ব্যবস্থা রাখা, বিল্ডিং কোড অনুসরণসহ ১৫টি নির্দেশনা প্রদান করেছেন। গতকাল সোমবার সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে সভাপতিত্বকালে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে ফায়ার ক্লিয়ারেন্স প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়; কিন্তু আমাদের বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম নেই। কাজেই এটি একটু পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে, বছর বছর এটি নবায়ন করা যায় কি না। যদি করা যায় তাহলে বাধ্য হয়েই সবাইকে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা নিতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে এখন এই কারণে আগুন লাগার হার অনেকটাই কমেছে। খুব কঠোরভাবেই এই আইনটি প্রয়োগ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো হচ্ছে: ১. বহুতল ভবন তৈরি করার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস সাধারণত একটি ক্লিয়ারেন্স দেয়। সেক্ষেত্রে এখন ক্লিয়ারেন্সই যথেষ্ট নয়, এটি পরিদর্শন করে এখানে বহুতল ভবন নির্মাণযোগ্য কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ২. ফায়ার সেফটির বিষয়টি নিয়মিত অনুসন্ধান করা এবং শিল্প কারখানার মতো প্রতি বছর এটি নবায়ন করা যায় কিনা, তা দেখা। ৩. বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা। ৪. নিয়মিত ফায়ার ড্রিল (অগ্নিনির্বাপণ মহড়া) করা; যেটি প্রতি তিনমাসে একবার হতে পারে। ৫. অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধোঁয়াতেই অধিকাংশ মানুষ শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়। কাজেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই স্মোক কন্ট্রোলের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা অনুসরণ করা। ৬. আগুন লাগলে পানির অভাব দূর করার জন্য রাজধানীর যেখানে যেখানে সম্ভব জলাশয় বা জলাধার তৈরি করা। ৭. রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশানসহ যেসব লেক রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণ করা। ৮. আগুন লাগলে ৩০ তলা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য বর্তমানে তিনটি সুউচ্চ মই (ল্যাডার) রয়েছে। এই সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা। ৯. ভবন নির্মাণের সময় স্থপতিরা যেন আমাদের পরিবেশ এবং বাস্তবতার নিরিখে বহুতল ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন। বর্তমানের ম্যাচ বাক্সের আদলে দরজা-জানালা ব্লক করে পুরো কাচ ঘেরাও দিয়ে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন করা হচ্ছে। সেভাবে না করে বারান্দা বা জানালা নির্মাণ করা; যাতে কোনো বিপদ ঘটলেও শ্বাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকে।

১০. ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শতভাগ ফায়ার এক্সিট নিশ্চিত করা। ১১. ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম ডোর ফায়ার এক্সিটে থাকবে না, সেগুলো ওপেন দরজা এবং ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ১২. দমকল বাহিনীর সেফটি গিয়ারে তারপলিন সিস্টেম এবং নেট সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করা; যাতে কোথাও আগুন লাগলে মানুষ তার মাধ্যমে ঝুলে ঝুলে নেমে যেতে পারে। ১৩. হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোতে রুমের বাইরে বারান্দা বা খোলা জায়গা রাখা। ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা অনেক সময় এগুলো ব্লক করে দেয়; সেটা যেন না হয়। ১৪. আগুনের সময় যেন কেউ লিফট ব্যবহার না করে, এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ প্রদান ১৫. প্রতিটি ভবনে কম করে হলেও দুইটি এক্সিট পয়েন্ট যেন থাকে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বনানী এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকণ্ডের ঘটনা তদন্তে তিনটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তাদের তদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এদিকে মন্ত্রিসভা বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।

পরে সাংবাদিকেরা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের কার্যালয়ে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা তাঁদের কাজকে আরো উজ্জীবিত করবে। বনানীর আগুনের ঘটনার পর দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ঢাকার বহুতল ভবনগুলো নির্মাণে কোনো অনিয়ম আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ২৪টি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। তাদের আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোন কোন ভবনে অনিয়ম রয়েছে বা ভবনগুলো কী অবস্থায় আছে, তার তথ্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হবে। এরপর মালিককে একটা সংক্ষিপ্ত সময় দিয়ে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হবে। এরপরও নিয়ম না মানলে ফৌজদারি ব্যবস্থাসহ যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৯ এবং গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৯’র খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।