তত্কালীন দৌলতপুর বাজারের গৌরমোহন সাহার দোকানে মাত্র ৫৪ জন ছাত্র নিয়ে মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৮৬৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পান পার্শ্ববর্তী সেনহাটি গ্রামের অভয় কুমার সেন। তিনি ওই বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক
জ্ঞানের আলো ছড়ানো এক অনন্য বাতিঘর খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর সরকারি মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দীর্ঘ দেড়শ’ বছর ধরে ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানের আলোক শিখা ছড়িয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি। খুলনা তখনও আলাদা জেলা হয়নি। খুলনা তখন ছিল যশোর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা এবং দৌলতপুর ছিল একটি অরণ্য ঘেরা পল্লিগ্রাম। সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের কাচারি (হাজী মুহাম্মদ মুহসিন এস্টেট) তখন দৌলতপুরে অবস্থিত ছিল। কাচারির ম্যানেজার ক্ষেত্র গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানীয় প্রজাসাধারণের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য এ অঞ্চলে একটি অ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুল খোলার পরিকল্পনা নেন। এ বিষয়ে তিনি এস্টেটের ইনচার্জ ডেপুটি কালেক্টর ব্রহ্মনাথ সেনের সঙ্গে আলাপ করেন। তার সম্মতি পেয়ে ক্ষেত্র গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৬৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আজকের ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবমণ্ডিত দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তত্কালীন দৌলতপুর বাজারের গৌরমোহন সাহার দোকানে মাত্র ৫৪ জন ছাত্র নিয়ে মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৮৬৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পান পার্শ্ববর্তী সেনহাটি গ্রামের অভয় কুমার সেন। তিনি ওই বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক। বিদ্যুত্ বেগে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা পার্শ্ববর্তী মহেশ্বরপাশা, সেনহাটি, বারাকপুর, দেয়ানা, পাবলা, খালিশপুর, চন্দনীমহল প্রভৃতি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মাত্র একমাসের মধ্যে ছাত্রসংখ্যা ৫৪ থেকে ১০০ জনে বৃদ্ধি পায়। এ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রধান শিক্ষক ছিলেন ঢাকার রাজমোহন ঘোষ।
সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের তদানিন্তন এজেন্ট ও যশোরের কালেক্টর মি. মনরো আইসিএস এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা মুসলমান সমাজের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা করে ১৮৬৮-৬৯ সালে এ স্কুলে মুসলমান ছাত্রদের জন্য মাদ্রাসা বিভাগ খোলেন। ফলে মুসলমান ছাত্ররা অনেক বিলম্ব হলেও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি কিছুটা হলে আকৃষ্ট হয়। ১৮৭০ সালে প্রথমবারের মত ১৩ জন ছাত্র ইংরেজি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং তার মধ্যে ১২ জন ছাত্রই কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়। এ ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে ও স্কুলের সার্বিক উন্নতি লক্ষ্য করে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার স্কুলে মাসিক ৩০ টাকা সাহায্য মঞ্জুর করেন।
১৯৩৬ সালে পূর্ণ বাবু প্রধান শিক্ষক পদে ইস্তফা দিয়ে যশোরের বনগ্রাম হাইস্কুলে চলে যান। তার শূন্য স্থানে স্কুলে প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন মালদহ জিলার আমিনুল হক বিএ, বিটি। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এ স্কুলেরই প্রাক্তন কৃতী ছাত্র আতিয়ার রহমান বিএ, বিটি। তার কার্যকালে যুক্তবাংলার প্রধানমন্ত্রী এ.কে ফজলুল হক এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এ বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ ভারতের মন্ত্রী মৌলভী নওশের আলী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তফা, মৃন্ময় শিল্পী শ্রী প্রমথনাথ পাল প্রমুখ।
মুহসিন স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই ভালো। ১৮৭০ সালে প্রথম পরীক্ষাতে অংশ নিয়েই কুঞ্জুবিহারী মজুমদার ও যাদবচন্দ্র বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে যশোর বোর্ডের প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় এ স্কুলের ছাত্র আবুল হাসনাত প্রথম স্থান অধিকার করেন। এছাড়াও অনেক কৃতী শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান লাভ করেছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জেএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাস এবং এসএসসিতে ৯৭.১৯% পাস করার কৃতিত্ব রয়েছে এ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের। বিদ্যালয়টি উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর হাজী মুহাম্মদ মুহসিনের ৩.০১৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়টিতে পাঁচটি দ্বিতল ভবন ও একটি মনোরম একতলা ভবন রয়েছে। যাতে কক্ষ সংখ্যা ৩৭টি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে জাতীয়করণের আওতায় ১৬ জন শিক্ষক, তিনজন কর্মচারী ও পাঁচজন অনিয়মিত কর্মচারী এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭৫৬ জন ছাত্র অধ্যয়নরত। এ বিদ্যালয়ে আছে সুবিশাল খেলার মাঠ। ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি অনেক আগেই সরকারিকরণ করার দাবি উঠলেও নানা কারণে তা হয়নি। তবে স্থানীয় জনমানুষের দাবি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বর্তমান সরকার ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এ বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়।
সরকারি হাজী মুহাম্মদ মুহসিন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম জোয়ার্দার বলেন, সরকারি মুহসিন স্কুলের রয়েছে একটি গৌরবময় সুদীর্ঘ ইতিহাস। খুলনার শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুলটি দীর্ঘ দেড়শ’ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে অবদান রেখে চলেছে।
ইত্তেফাক/নূহু
