জঙ্গি অভিযানে গোয়েন্দা নয় তথ্য দিয়েছে এলাকাবাসী

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৭, ১০:৪০
 
রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান গোয়েন্দারা নয়, দিয়েছেন বাড়িওয়ালা-এলাকাবাসী। এ তথ্য দিয়েছেন জঙ্গি অভিযানে সরাসরি সম্পৃক্ত পুলিশ সদর দফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
 
তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। শুরুতে সাধারণ মানুষ কিছুটা অন্ধকারে ছিল। কিন্তু পুলিশ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের জঙ্গি বিরোধী প্রচারণার ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তারই প্রমাণ পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক সময় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময়। তিনি আরো বলেন, রাজধানীর কল্যাণপুর, আশুলিয়া, গাজীপুরের পাতারটেক, আশকোনা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, কুমিল্লা, সিলেট ও মৌলভীবাজারে জঙ্গি আস্তানার খবর এলাকাবাসী পুলিশকে জানিয়েছে। সিলেটে জঙ্গি আস্তানার খবর রাত আড়াইটার দিকে দিয়েছিলেন খোদ বাড়ির মালিক। আর ওই অভিযান চলাকালীন মৌলভীবাজারের জঙ্গি আস্তানারও সন্ধান দিয়েছিল এলাকাবাসী। এরমধ্যে কোনো ধরনের আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছিল না।
 
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতী বোমা হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছে ৫ শিশু, নারীসহ ৫৩ জন। আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২২ জন। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে ২৫০ জন। আর জঙ্গিদের নিক্ষিপ্ত বোমায় নিহত হয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৭ জন। আহত হয়েছেন র‌্যাব পুলিশের ৪২ জন্য সদস্য। এ সময় জঙ্গি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৬৪টি। এরমধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে তিনটি মামলার। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ১৮টির। ফাইন রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ১টি মামলার। তদন্তাধীন আছে ৪১টি। জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৭টি পিস্তল, ৪টি একে-২২ এসএমজি, গুলি ১৯৭০টি, ম্যাগাজিন ৫৫টি, হ্যান্ড গ্রেনেড ২২০টি, ককটেল ৪টি, বোমা ১২১টি, অন্যান্য বিস্ফোরক ১৭১টি, ডেটোনেটর ১৫শ’, মোটরসাইকেল ১১টি, ল্যাপটপ ১০টি ও ক্যামেরা ৩টি।
 
জঙ্গি আস্তানার সন্ধানে সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (গোপনীয়) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রথম দিকে ব্যাপক প্রচারণা না থাকার কারণেই সাধারণ মানুষ হয়তো সহযোগিতা করতে পারেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন ধর্মীয় সামাজিক সংগঠনের জঙ্গি বিরোধী প্রচারণার কারণে সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। আর সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেলে আমরা খুব দ্রুত জঙ্গিদের নির্মূল করতে সক্ষম হব।
 
তিনি আরো বলেন, জঙ্গিদের চেনা এখন খুব কষ্টসাধ্য নয়। বাড়ির মালিক ও এলাকাবাসী একটু নজর রাখলেই তাদেরকে শনাক্ত করতে পারেন। কারণ জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যারা সম্পৃক্ত তারা বাসা থেকে দিনে খুব একটা বের হয় না। সন্তানদের পাঠায় না স্কুলে। প্রতিবেশী, পাশের ফ্ল্যাট বা এলাকার লোকজনের সঙ্গেও তারা মেশে না। এসব বিষয় একটু পর্যালোচনা করলেই জঙ্গিদের শনাক্ত করা সম্ভব।
 
সম্প্রতি জঙ্গি অপারেশনে যোগ দেওয়া পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিরা আত্মঘাতী। স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তাদের কোনো মমত্ববোধ নেই। ফলে এদেরকে পরাস্ত করা বড় জটিল। এ কারণে কোনো জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তত্পরতার কারণে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তবে তাদের কর্মকাণ্ড থেমে নেই। সম্প্রতি বেশকিছু টার্গেট নিয়ে তারা তত্পরতা শুরু করেছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহায়তার কারণেই তা সম্ভব হয়নি। জঙ্গিদের সংখ্যা কেমন হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে খুব একটা বেশি হবে না।
 
এ কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে জঙ্গি অভিযানের প্রচারণার ক্ষেত্রে কঠোরতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। আর এ কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিকল্পনা নিয়ে লেখালেখির কারণে জঙ্গিরাও সতর্ক হয়ে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তাদের মোকাবিলা করে যাচ্ছে। পুলিশের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, জঙ্গি প্রতিরোধে বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা অনেক। খোদ ইন্টারপোল মহাসচিবও আমাদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছেন। তবে যে যাই বলুক জঙ্গি তত্পরতা নির্মূল করতে সাধারণ মানুষের সচেতনতাই সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে।
 
ইত্তেফাক/কাউছার