সুনামগঞ্জ কমলগঞ্জ ধুনটে বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত পানির নিচে

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৭, ০০:৪৩

দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় অকাল বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। সিলেট বিভাগের চার জেলায় প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। কেবল সুনামগঞ্জে ৯৭ হাজার ৮৬২ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়। বগুড়ার ধুনট উপজেলার সন্নিকটে যমুনার পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যেই ৫শ’ বিঘা জমির কালো জাতের আধা-পাকা বোরো ধান পানির নিচে। কমলগঞ্জে উপজেলায় ৮০ শতাংশ বোরোক্ষেত পানির নিচে। উজান থেকে নেমে আসা পানিতে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে সপ্তাহব্যাপী ভারিবর্ষণ, পাহাড়ি ঢল বর্তমানে হ্রাস পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক কৃষকের আহাজারি থামেনি। ফসলের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বাড়ছেই। বন্যায়  সিলেট অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক ক্ষতির ফলে সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন। হাজার কোটি টাকার বেশি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় করা হচ্ছে। এবার সমগ্র সিলেট জুড়েই ফসল হারানোর বেদনা। জেলা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি ব্যারিস্টার ইনামুল কবীর ইমন গতকাল রাতে মুঠোফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘শস্যভাণ্ডার সুনামগঞ্জের অবস্থা করুণ। অনেক স্থানেই বাঁধ রক্ষার কাজ সঠিক ভাবে হয়নি। কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত জেলার ২২টি হাওরের ফসল ডুবেছে। বাকি ২০টি হাওর টিকিয়ে রাখতে আমরা জোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’ বাজারে চাল, আটাসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এখন বড় কাজ হচ্ছে চালসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সেটির জন্য উপজেলা পর্যায়ে মাইকিং হচ্ছে। যাতে কেউ চালের দাম না বাড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের নিকট প্রচুর খাদ্য শস্য মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনমত বাজারে ছাড়া যাবে। সোমবার থেকে ওএমএস কর্মসূচি শুরু হবে।’ জেলা প্রশাসক জানান, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের মনিটরিং হচ্ছে।

বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা বলেন, বাঁধ নির্মাণে অবহেলার কারণে অনেক স্থানেই এখন কষ্ট করতে হচ্ছে। সুনামগঞ্জ  সদর উপজেলার মোহনপুর ইউপি সদস্য নূরুল হক বলেন, তার এলাকার ডাকুয়াখালী ও জোয়াল ভাঙ্গার একগুটা ধানও তোলা সম্ভব হয়নি। ফসলহারা মানুষ এখন গরু-বাছুর নিয়ে বিপদে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার ৪২টি হাওরের এই ফসল রক্ষায় ৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। কৃষকদের অভিযোগ, বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া এবং কাজে অনিয়মের কারণেই হাওরে এই অসময়ে ফসলহানি ঘটে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জেলা বিএনপি। শনিবার দুপুরে শহরের পূরবী সুপার মার্কেটে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জেলা বিএনপির আহবায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পিআইসি, ঠিকাদার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সুনামগঞ্জের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। চরম উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে জেলার কয়েক লাখ মানুষ।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, অবিরাম বর্ষণে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর দুটি ভাঙনে নদ-নদী ও পাহাড়ি ছড়ার পানি বৃদ্ধি পেয়ে কমলগঞ্জে অকাল বন্যার সৃষ্টি হয়। পানি নিম্নাঞ্চলে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির শিকার কৃষকরা হাহাকার করছেন। নতুন করে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উজান থেকে পানি দ্রুত নেমে গেলেও নিম্নাঞ্চলের শমশেরনগর, পতনউষার ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বিশাল এলাকা নিমজ্জিত রয়েছে। লাঘাটা নদী দিয়ে ঝোপজঙ্গল থাকায় দ্রুত পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কেওলার হাওরসহ এই এলাকার বিস্তীর্ণ বোরো ধান পানির নিচে জলাবদ্ধ রয়েছে। পতনউষারের কৃষক মানিক মিয়া, মদরিছ মিয়া, শমশেরনগরের ফজলু মিয়া, আশিক মিয়া ও লাঘাটাছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অনেকেই ঋণ নিয়ে বোরো চাষাবাদ করলেও প্রথম দফা ঢলের পানি ও পরে বন্যায় সম্পূর্ণ এলাকার বোরো ক্ষেত বিনষ্ট হয়েছে। কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে।

ধুনট (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে চরাঞ্চলের কৃষকরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক কৃষক তাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পানির নিচে ডুবে ধান কাটছেন। নিউসারিয়াকান্দি গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, পানির নিচে ডুবে যাওয়া ধানগুলো অনেক কৃষকেই কাটতে পারছেন না। শ্রমিক খরচ দিয়ে কেউ কেউ আবার অপরিপক্ব ধান কাটলেও লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান যদি পাকা হতো তাহলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু আধাপাকা ধান হওয়ায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে বাড়িতে এনে গরুকে খাওয়াচ্ছেন।
ইত্তেফাক/নূহু