জ্বালানি সংকটে উত্পাদন ব্যাহত

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ২৩:৩০

গ্যাস— বিদ্যুত্ সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না। এতে পণ্যের মান খারাপ হচ্ছে এবং সময়মত রফতানি আদেশও পরিপালন করা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি জ্বালানি সংকট এতটাই তীব্র হচ্ছে যে, উদ্যোক্তারা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। যা অগ্রসরমান অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে, বিদ্যমান কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও নতুন করে কোন কোন কারখানায় গ্যাস সংযোগের কাজ হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও এই মুহূর্তে সরকারের নীতি অনুযায়ী নতুন করে গ্যাস সংযোগ নিষিদ্ধ রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, একাধিক লাইন থেকে বিদ্যুত্ সংযোগ থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের অভাবে কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না। শিল্পকারখানা একবার চালু হলে যদি বিদ্যুত্ চলে যায়, তা চালু করতে সময় লাগে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে পণ্যের মান খারাপ হয় এবং ক্রেতাস্বার্থে বিঘ্ন ঘটে। পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ে দেশ। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উত্পাদনমুখী খাতে বন্ধ্যত্ব দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তাতে, ব্যাপক হারে শ্রমিক ছাঁটাই এবং ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশে এমনিতেই ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি। বিশ্বের কোন দেশে এতে বেশি হারে সুদ গুনতে হয় না। ডাবল ডিজিট সুদের হার আরোপের বাইরেও ব্যাংকগুলোর অনেক লুকায়িত চার্জ থাকে। সবমিলিয়ে ঋণের কিস্তির পরিমাণও বেশি হয়। এমতাবস্থায়, বিদ্যুত্—গ্যাস সংকটে উত্পাদন বাধাগ্রস্ত হলেও  উদ্যোক্তাকে ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয়। দেশে যখন এমন এক অবস্থা বিরাজমান, তখন অন্যান্য খাতের সঙ্গে শিল্পখাতেও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে সরকার। যা ‘শিল্পবান্ধব নীতি’ বা ‘শিল্পসহায়ক পরিবেশের পরিপন্থী।

বিদ্যুতের আসা—যাওয়ার খেলা

শিল্পখাতে বিদ্যুত্ সংকটের ব্যাপারে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। প্রায় সব শিল্প এলাকাতেই একই অবস্থা। সাভার এলাকায় গত ৩০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত এক সপ্তাহের বিদ্যুত্ সরবরাহের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ হয়নি। সর্বনিম্ন ১০ মিনিট থেকে শুরু করে একাধিকবারে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা শিল্পকারখানায় বিদ্যুত্ ছিল না। মার্চ মাসের শেষ দিন তিনবারে ত্রিশ মিনিট বিদ্যুত্ ছিল না। ১ এপ্রিল ১১ কেভি লাইনে একবারেই তেত্রিশ মিনিট, ৩৩ কেভি লাইন থেকে দুই বারে প্রায় ৪ ঘণ্টা বিদ্যুত্ ছিল না। গত ২ এপ্রিল দুটি লাইন থেকে দুই বার করে যথাক্রমে ২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট ও ৪৩ মিনিট, ৩ এপ্রিল পাঁচবার ও দুই বারে যথাক্রমে সাড়ে ৫ ঘণ্টা ও ৪ ঘণ্টা বিদ্যুত্ ছিল না কোনো কোনো কারখানায়। পরদিন ৪ এপ্রিল ১১ কেভি লাইনে ৫ বারে ৭ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট এবং ৩৩ কেভি লাইনে দুই বারে ১ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট বিদ্যুত্ ছিল না। ৫ এপ্রিল দুটি লাইন থেকেই যথাক্রমে ৪ বার ও ৩ বার লোডশেডিং হয়। এতে প্রায় ৪ ঘণ্টা ও সোয়া ঘণ্টার মতো বিদ্যুত্ ছিল না।

বিদ্যুত্ সরবরাহের এই চিত্রে স্পষ্ট যে, কারখানাগুলো জ্বালানি সংকটে পণ্য উত্পাদন ও সঠিক মান ধরে রাখতে পারছে না। উদ্যোক্তারা পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে গিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করলেও তা টেকসই হচ্ছে না। বরং বারবার লোডশেডিংয়ের কারণে পণ্যের মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বক্ষণিক জেনারেটর চালু রাখতে হচ্ছে। যা উত্পাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। এটি মূল্য প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে দিচ্ছে। আবার স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর টানা দুতিন ঘণ্টার বেশি চালানো যায় না। তাতে জেনারেটর দ্রুত নষ্ট হয়। সেটিও উত্পাদনে বিঘ্ন ঘটায়। ফলস্বরূপ, সঠিক সময়ে পণ্য বায়ারদের কাছে পৌঁছানো যায় না।

গ্যাস সংযোগ বন্ধ না চালু

পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অন্যান্য খাতের মতো শিল্পখাতেও গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। নতুন করে শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। যেখানে বিদ্যমান কারখানাগুলোতেই চাহিদামত সরবরাহ নেই, সেখানে নতুন করে সংযোগ দিয়ে লাভ কী? কিন্তু বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তটিও গোলমেলে। খোদ সাভার এলাকাতেই কোনো কোনো স্পিনিং কারখানায় গ্যাস সংযোগের কাজ চলছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলেছে, গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন একটি কমিটি রয়েছে। ঐ কমিটিতে আবেদন করে কেউ অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিদ্যমান কারখানাই যেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, সেখানে নতুন করে সংযোগ দিয়ে আরো সংকটের সৃষ্টি হবে না তো?

জ্বালানি পরিস্থিতি কতটা শিল্পসহায়ক

বাংলাদেশের মধ্য আয়ের দেশে যাওয়ার যে লক্ষ্য রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি মোটেই সহায়ক নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বাংলাদেশের শিল্পখাতে যে অর্জন তা ধরে রাখা এবং যথাযথ প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হলে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে। বিদ্যুত্—গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উত্পাদন প্রক্রিয়া মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংকগুলোতে এখন যে পরিমাণ তারল্য রয়েছে, তা বিনিয়োগ হচ্ছে না তার মূল কারণ সুদের হার বেশি এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুত্—গ্যাস সুবিধার অভাব। জ্বালানি সুবিধা বাড়িয়ে সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তাতে জনগণের আয় বাড়লে সঞ্চয় এবং প্রবৃদ্ধি দুটোই বাড়বে।

ইত্তেফাক/নূহু