জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, দুই’শ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক আমলের আইন দিয়ে স্বাধীন দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা দুরূহ বিষয়। আমাদের আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে এই অবস্থার মধ্যে যে আইন সহায়তা প্রদান করেন তা প্রকৃতপক্ষে কঠিন কাজ। বিপন্ন ও ভুক্তভোগীদের জন্য আপদে-বিপদে আইনজীবীরাই হচ্ছেন ভরসা।
তিনি গতকাল বুধবার পিরোজপুরে জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরো বলেন, আর্থিক অসংগতির কারণে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেক সময় বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব হয় না। আর্থিক অসচ্ছলতাও ন্যায়বিচার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে। এ অবস্থায় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে আইনজীবীরাই এই দুরবস্থা থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিতে পারেন। মামলা-মোকদ্দমা, আপদ-বিপদে তাই আইনজীবী সমাজ মানুষের বন্ধু ও ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। গরীব মক্কেলদের মামলা বিনা খরচে পরিচালনা করেন এমন আইনজীবীর সংখ্যাও আমাদের সমাজে কম নয়। তিনি বলেন, আমাদের তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে, আইনের কাছে আশ্রয় নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। বিচার বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগ যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় তার জন্য সবার প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সংঘাতমুক্ত-দ্বন্দ্বমুক্ত সমাজে কাজ করার পরিবেশ থাকে। আবার কাজ করার জন্য সিস্টেমকেও অনুসরণ করতে হয়। যখন এই পরিবেশ হয় নানা মুনির নানা মত বহুল এবং ঝঞ্ঝাটপূর্ণ তখন কাজে নিয়োজিতরা তা বাস্তবায়ন করতে অস্বস্তিতে পড়েন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাই আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সৃষ্টি করে উন্নয়ন বান্ধব পরিবেশ আনয়ন করা। মানুষ যদি সব সময় বিষণ্নতা আর উদ্বিগ্নতার মাঝে বসবাস করে তাহলে অজানা ভয়ভীতি আর আশঙ্কা সবসময় তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
তিনি বলেন, আমাদের তাই এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে যেখানে সবার আত্মসন্তুষ্টি আর প্রাপ্তির সকল ইতিবাচক অবস্থা বজায় থাকে। তবে এই প্রাপ্তি যেনো কখনোই ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতার মধ্যে আবর্তিত না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাধীন দেশের রাজনীতি আর পরাধীনতার রাজনীতি অবশ্যই এক হতে পারে না। কাজ করার জন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ, প্রাপ্তির আগ্রহ, এলাকার মানুষের ত্যাগের মানসিকতা এবং ঐক্য থাকা বাঞ্ছনীয়। ব্যক্তি কেন্দ্রিক রাজনীতি এলাকাবাসীকে বহুলাংশে তার অধিকার ও হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে।
মন্ত্রী বলেন, সেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে আমরা গত ৫০ বছরে দেশের সকল পরিবর্তনের সঙ্গে থেকে নিজেদের ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় আছি। ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে হলেও দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। আল্লাহ কাউকে নেতৃত্বে বসিয়ে তার ঈমানের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অন্যের জন্য অবদান রাখতে হলে নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে হয়। রাজনীতিবিদরা ২৫/৩০ বছর রাস্তায় থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করে, জেল-জুলুম সহ্য করে ক্ষমতায় আসেন। তাঁদের এই ত্যাগ-তিতীক্ষা আর কষ্টের কথা মনে রেখেই ক্ষমতার ব্যবহার করা উচিত। তাদের চিন্তা ও আচরণ স্বাধীন দেশে হতে হয় আরও গভীর ও প্রখর। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই দেখে এসেছি আমাদের পিতা মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জেল-জুলুম মোকাবিলা করেছেন। সে দিনগুলোর কথা মনে রেখেই আজকে দেশের জন্য মানুষের জন্য যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছি।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, ১৭ বছর সরকারে অবস্থান এবং ৩৩ বছর ধরে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের উপলব্ধি হচ্ছে উন্নয়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে একতা। পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠির জন্য কাজ করার যে সৌভাগ্য হয়েছে তার পিছনে এলাকাবাসীর সমর্থনই প্রেরণা যুগিয়েছে। আজকে পিরোজপুর যে ঢাকাসহ সারা দেশের সাথে সড়ক যোগাযোগ ক্ষেত্রে সংযুক্ত সেখানে আমাদের প্রচেষ্টাই এভাবে কাজ করেছে। মনে রাখতে হবে কাজ করতে হলে সব সময় খোলা ও উদার মন, একতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রকে যেমন বজায় রাখতে হবে তেমনি এলাকায় শান্তি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দল-মত নির্বিশেষে উন্নয়ন বান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা অপরিহার্য। পিরোজপুর আইনজীবী সমিতি ভবনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিনান্স কমিটির চেয়ারম্যান এডভোকেট শ ম রেজাউল করিম, হাউস কমিটির চেয়ারম্যান এডভোকেট পারভেজ আলম খান, পিরোজপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মজিবুর রহমান খালেক, এডভোকেট চন্ডী চরণ পাল, এডভোকেট এমএ মান্নান, এডভোকেট কানাই লাল বিশ্বাস, এডভোকেট মতিউর রহমান, এডভোকেট শহীদুল হক খান পান্না জিপি ও সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আহসানুল কবির বাদল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট খান মো. আলাউদ্দিন পিপি। অনুষ্ঠানে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সেখ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্যসহ এডভোকেটরা উপস্থিত ছিলেন।
সড়কের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন
এদিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বিকালে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা সদরে চারাখালী-রামচন্দ্রপুর সড়কের নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এখানে তিনি দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। এছাড়া সম্প্রতি ইন্দুরকানী বাজারে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নুরুল হুদা, ভাইস চেয়ারম্যান ফায়জুল কবির তালুকদার, আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি মতিউর রহমান, উপজেলা জেপি’র সভাপতি আসাদুল কবির তালুকদার স্বপন, সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মঞ্জু, পত্তাশী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার বাবুল, বালিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন বয়াতি প্রমুখ।
ইত্তেফাক/নূহু
