ফুটবল মাঠে গত এক দশকে নতুন নতুন ক্লাব এসেছে। কিন্তু মাঠে দর্শক আসেনি। বড় বড় পৃষ্ঠপোষকরা শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে অর্থভাণ্ডার খুলে দিয়ে দল গঠন করেছেন। চট্টগ্রাম আবাহনীকে নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলা হয়েছে। তারপরও মাঠে দর্শক টানতে পারেনি কোনো দল। এই ক্লাবগুলো কোনো কোনো ফুটবলারকে ৭০ লাখ টাকাও দিয়েছে। তারপরও সেই ৭০ লাখ টাকার খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে কৌতূহল জাগেনি দর্শকের।
মাঠে দর্শক আসে না কেন-জানতে চাইলে মোহামেডানের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন পালটা প্রশ্ন করলেন, আপনি বলুন না দর্শক কেন আসে না? তারপর বললেন,‘দর্শক কেন আসবে? তারা তো আগেই জেনে যায় পাতানো খেলা হবে। আর কার খেলা দেখতে আসবে। এখনকার কোনো ফুটবলারের খেলা দেখার আগ্রহ দর্শকের আছে নাকি। মোহামেডান আবাহনী ভালো খেলোয়াড় পাবে কোথায়। পাইপ লাইনে খেলোয়াড় নেই।’ ক্লাব কেন খেলোয়াড় তৈরি করছে না-এ প্রশ্নের জবাবে লোকমান বলেন, ‘মোহামেডান আবাহনী কখনো খেলোয়াড় তৈরি করেনি। আর এখন মোহামেডান আবাহনীর আর্থিক অবস্থাও সচ্ছল না যে খেলোয়াড় তৈরি করে খেলাবে।’
বিভিন্ন ক্লাবসূত্রে জানা গেছে, শুধু ঘরোয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং লিগ খেলাকে কেন্দ্র করে ১২টি ক্লাব গত এক দশকে ফুটবলে কমবেশি অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু গ্যালারি ভরতে পারেনি। সুখ্যাতি আছে মোহামেডান আবাহনীর। এই দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের দিনেও স্টেডিয়াম প্রায় ফাঁকা থাকছে। অথচ একটা সময় মোহামেডানের অনুশীলন দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে হাজার হাজার দর্শক ভিড় করত। ধানমন্ডিতে আবাহনীর অনুশীলনে দর্শক ঠেকাতে হিমশিম খেতে হতো।
সাবেক ফুটবলার হাসানুজ্জামান খান বাবলুর মতে বাংলাদেশের ফুটবল নষ্ট করার পেছনে ক্লাব এবং বাফুফে দায়ী। এদেশের ফুটবল যখন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তায় তখন ক্লাব কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের চড়া পারিশ্রমিক ঠেকাতে ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ করেন। এক ক্লাব আরেক ক্লাবের খেলোয়াড় নেবে না। বাফুফে সে সময় এই সর্বনাশা চুক্তি বাতিলের চেষ্টা করেনি। নীরবে উত্সাহ দিয়েছে। ঢাকার লিগের পর চট্টগ্রামের লিগ ছিল জনপ্রিয়। চট্টগ্রামে তখন বড় বড় দল গঠন করা হতো। ঢাকায় আবাহনীর মোনেম মুন্না চট্টগ্রামে মোহামেডানে খেলেছেন। আবাহনীর আসলাম, ছোট কামালরা খেলেছেন কাস্টমসে। ঢাকার লিগ খেলে ফুটবলাররা চট্টগ্রামের লিগ খেলতে চলে যেতেন। এরপর বাফুফে খেলোয়াড়দের পায়ে শেকল দিল। আইন করল এক প্লেয়ার এক লিগ খেলবে। বাফুফের যুক্তি ছিল ঢাকার প্লেয়াররা জেলায় খেললে সেখানকার স্থানীয় ফুটবলাররা জায়গা পায় না। আর ঢাকার লিগের শেখ আসলামদের যুক্তি ছিল তারা খেললে জেলার ফুটবল চাঙ্গা হয়। নতুনরা মাঠে ভিড় করে। কয়েক বছরেই প্রমাণ হলো বাফুফের সিদ্ধান্তটি ছিল আত্মঘাতী। এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে বাফুফে পুলপ্রথা চালু করল। এক ক্লাব পাঁচ জনের বেশি খেলোয়াড় নিতে পারবে না। ফুটবল উন্নয়নের কফিনে আরো একটি পেরেক ঠুকে দিল এই আইন।
এক খেলোয়াড় এক লিগ, পুলপ্রথা এবং জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট চালুর মধ্য দিয়ে ফুটবল ধ্বংসের সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও বাফুফে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরো একটি গোপন চুক্তি। সেটির নাম পাতানো খেলা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ছেড়ে খেলাটা যখন মিরপুর স্টেডিয়ামে গেল সেখানে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শক প্রতারিত হয়েছে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই জানা যেত ম্যাচের ফল কী হতে যাচ্ছে। ম্যাচ শেষে যখন দর্শক দেখতেন গুঞ্জনই সত্যি হয়েছে, তখন ফুটবলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। এভাবে গলা টিপে দেশের ফুটবলকে হত্যা করেছে বাফুফে এবং ক্লাব রাজনীতি।
এত কিছুর পরও এদেশের ফুটবলে সম্ভাবনা আছে। ভালো খেলা হলে দর্শক গ্যালারিতে বসে, সেটা ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ। কোটি টাকা প্রাইজমানির সুপার কাপ ফুটবল ফাইনালে স্টেডিয়ামে উপচেপড়া দর্শক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে সাধারণ মানুষের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। যে কারণে এত দৈন্যদশার মধ্যেও নতুন ফুটবল মৌসুমে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব, নোফেল ক্লাব ও এফসি চট্টগ্রাম নামে আরো তিনটি নতুন দল আসছে বলে শোনা যাচ্ছে।
