চারদিকে বাঁচাও বাঁচাও আর্তি। সড়কে মানুষের আহাজারি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু সবাই অসহায়। গত বৃহস্পতিবার বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন ডালপালা ছড়াচ্ছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে গোটা ভবন। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন লম্বা পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছে। কিন্তু পাইপের এক জায়গায় ছিদ্র। তা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। একটু পানিও সে সময় মহামূল্যবান। চোখের সামনে এ পানির অপচয় দেখে স্থির থাকতে পারেনি আট বছর বয়সী মো. নাঈম ইসলাম। পলিথিন পেঁচিয়ে সেখানে পা দিয়ে ঠেসে ধরে। চোখে মুখে তার অন্যরকম অভিব্যক্তি। আর সেই ছবিই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে গোটা দেশেই সে এখন মানবতার হিরো, মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার হিরো। গত রবিবার রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুপুর ১২টার দিকে দেখা মিলে নাঈমের। সেখানেই প্রজন্মের সঙ্গে কথা হয় তার। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আকরাম হোসেন ও ছবি তুলেছেন তন্ময় মির্জা
ওইদিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ওইদিন আমি আমার মায়ের কাছ থেকে আগুন লাগার কথা জানতে পারি। খবর শোনার পরপরই আমি ছুটে যাই। গিয়ে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিসের উনারা আগুন নেভানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল তাদের সাহায্য করা প্রয়োজন। আরএফ ভবনের পিছনের অংশ তখন ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। ভবনের উপরে নিচে কান্না আর চিত্কারের শব্দ। তাদের বাঁচার আকুতি দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা করি। কিন্তু কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মানুষের চাপাচাপির মধ্যে দাঁড়াতেও পারছিলাম না। তখন আমার পায়ের পাশে ফায়ার সার্ভিসের একটি পানির পাইপ ছিল। ওই পাইপ লিক হয়ে পানি বের হয়ে যাচ্ছিল। তাই প্রথমে আমি হাত দিয়ে ওই পাইপ চেপে ধরেছিলাম। কিন্তু আমার ছোট হাত দিয়ে পানি আটকাতে পারছিলাম না। পরে একটি পলিথিন সংগ্রহ করে সেটি দিয়ে পাইপ পেঁচিয়ে পা দিয়ে চাপ দিয়ে ধরি। ভেবেছিলাম এক ফোঁটা পানিও যাতে নষ্ট না হয়। তখন শুধু মনে হচ্ছিল একটি মানুষকেও অন্তত যদি বাঁচানো যায়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি সেখানে ছিলাম। আমি এর আগেও আগুন নেভানোর কাজ করেছি, তখন আমার বন্ধুরা আমার সাথে ছিল।
তোমার ছবি ভাইরাল হয়েছে কিভাবে জানলে?
আমি বাসায় আসার পর বস্তির মালিকের ভাগ্নে মেহেদি মোবাইলে ছবি দেখিয়ে বলল আমার ছবি ফেসবুকে আসছে। এই ছবি নাকি লাখ লাখ মানুষ দেখছে। আমি জানি না কে আমার ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছে। ছবি দেখে প্রথম আমার খুব ভয় লেগেছিল। যদি কিছু হয় এই ভেবে। পরে সবাই যখন আমাকে বলল এই কাজটির জন্য সবাই আমার প্রশংসা করছে, তখন আর ভয় করেনি।
এই ঘটনার পর এখন অনেকে তোমাকে চেনে। এখন কেমন বোধ করছ তুমি?
অনেক ভালো লাগছে। অনেকে আমাকে দেখতে আসছে, আমার ছবি তুলছে। আগে স্কুলে অনেকে আমাকে মারত। এখন আর কেউ মারে না। আমার স্যার-ম্যামও আমাকে অনেক আদর করে।
তোমার জন্য একজন প্রবাসী ৫০০০ ডলার পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তার সঙ্গে কী যোগাযোগ হয়েছে?
না উনি আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করে নাই।
এই টাকা দিয়ে তুমি কী করবে?
আমাদের কোনো জায়গা জমি নেই। এই টাকা পেলে আমি আমার গ্রামে জায়গা জমি কিনে একটা এতিমখানা বানাব। কারণ আমি আল্লাহর রহমতে সুখেই আছি। আমার মা-বাবা আছে। যদিও বাবা কাছে নেই কিন্তু অনেকের মা-বাবা একেবারেই নেই। আর আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে কী বলবে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব আমি বড় হয়ে একজন সত্ পুলিশ অফিসার হতে চাই।
পরিবারে কে কে আছে?
আমি, আমার মা ও আমার ছোট বোন। আমার বাবা ছয় বছর আগে আমার মাকে, আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে।
তোমার জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট কী?
আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি ওইদিন—যখন আমার চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল, মানুষ পুড়ে মরছিল কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।
সবার উদ্দেশে তোমার কি কিছু বলার আছে?
আমি সবার উদ্দেশে বলতে চাই, ওইদিন তারা যদি ছবি না তুলে আমার মতো ফায়ার সার্ভিসকে সাহায্য করত, তাহলে আরও অনেক মানুষ বেঁচে যেত।
নাঈমের মা বলেন :আমার ছেলের অনেক ছোট সময় থেকে স্বপ্ন সে পুলিশ অফিসার হবে। সে এখনো অনেক ছোট। তবে সে সবসময় তার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের বিপদে আপদে এগিয়ে যায়। আমি সবসময় তাকে এসব কাজে উত্সাহ দিই। আমার ছেলের জন্য সবাই দোয়া করবেন। সে যেন বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। নাঈমের বাবা রাস্তায় রাস্তায় ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করেন আর মা অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করেন। বর্তমানে কড়াইল বস্তির আনন্দ স্কুল নামের একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে নাঈম।
নাঈমের স্কুল শিক্ষিকা মোছা. তাছলিমা বলেন :নাঈম অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। তার মাঝে অনেক প্রতিভা আছে। লেখাপড়ার ব্যাপারে অনেক আগ্রহী। সে নিয়মিত ক্লাস করে এবং শিক্ষকদের সাথে অনেক ভালো ব্যবহার করে।
