শহরে যেতে ভীষণ ভয় করত শিয়ালের। শহরে যাওয়া মাত্রই তাকে তাড়া করত কুকুরের দল। তবে একদিন বনে কোনো খাবার না পেয়ে সে বাধ্য হয়েই খাবারের সন্ধানে শহরে এল। হন্যে হয়ে খাবারের খোঁজ করল চারদিকে। কিন্তু কোথাও খাবার পেল না। এদিকে কুকুরেরা গন্ধ শুঁকে শহরে শিয়ালের আগমন টের পেয়ে গেল। তারা ভয়ংকরভাবে ঘেউঘেউ করতে করতে শিয়ালটিকে তাড়া করল।
শিয়ালটি সরু গলি ধরে মরি-বাঁচি করে দৌড়াতে লাগল। ঢুকে পড়ল একটি ঘরের আধখোলা দরজা গলে ভেতরে। সেই ঘরে ছিল নীল রঙের তরলভর্তি একটি চৌবাচ্চা। পড়বি তো পড় সে চৌবাচ্চায় গিয়ে পড়ল শিয়ালটি। কুকুরের ডাক বন্ধ হয়ে গেলে চৌবাচ্চার ভেতর থেকে উঠে এল সে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল তার সারা শরীর গাঢ় নীল রং ধারণ করেছে। এই অবস্থাতেই সে দ্রুত বনে ফিরে এল। বনের অন্য পশুরা তাকে মোটেই চিনতে পারল না।
ভিন্ন রঙের অচেনা পশু দেখে সবাই তার দিকে সমীহ করে তাকাতে লাগল। আদতে দুনিয়াতে কোনো নীল শিয়ালই যে নেই। সে তার পরিবর্তিত অবস্থা কাজে লাগিয়ে সুবিধা আদায় করার ফন্দি আঁটল। বনের বাঘ, কুকুর, শূকর, হরিণ, খরগোশসহ সকল পশুকে সম্বোধন করে বলল, ‘সুপ্রিয় পশুরা, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি তোমাদের ভালোমন্দ দেখার জন্যে রাজা হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’
সমবেত পশুরা নীল রঙের অদ্ভুত ধরনের পশুটির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলো সত্যি বলে মনে করল। তারা তাকে রাজা এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মেনে নিল। প্রজাদের সাহস দিয়ে সে বলল, ‘তোমরা আমাকে আমার প্রাপ্য আরাম-আয়েশ জোগাবে। আমি তোমাদের শত্রুর আক্রমণ, রোগ-শোক এবং যে কোনো রকম দুর্যোগ থেকে রক্ষা করবো।’
সেদিন থেকে নীল শিয়াল প্রচুর খাবার ও সেবাযত্ন পেয়ে আসছিল। সহসাই বনের পশুরা তার অনুগত হয়ে পড়ল। শিয়াল তাদের ঝগড়াঝাঁটি মীমাংসা এবং ব্যক্তিগত ও দলগত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শও দিতে লাগল। তার গায়ের কৃত্রিম রংকে সৃষ্টিকর্তার দান হিসেবে ফলাও করে প্রচার করতে লাগল চালাক শিয়ালটি। এভাবে সে বেশ সুন্দর সময় পার করছিল। এক সন্ধ্যায় একদল শিয়াল কাছাকাছি জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল। আর অভ্যাসমতো একযোগে ‘হুক্কা-হুয়া’ ডাক দিচ্ছিল যেতে যেতে। ডাক শুনে রঙিন শিয়ালটি নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সেও অভ্যাসমতো হঠাত্ ‘হুক্কা-হুয়া’ বলে ডেকে উঠল।
এতে প্রজা পশুদের বুঝতে আর বাকি রইল না যে রাজা বলে দাবি করা পশুটি আসলে একটি প্রতারক শিয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। শিয়ালটি তার বোকামি বুঝতে পেরে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করল।
পুনর্কথন : আহমেদ জসিম
